শিরোনাম
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১২:৪৫, ১৭-১০-২০২৬ | আপডেট: ১২:৪৫, ১৭-১০-২০২৬
ছবি: মেডিকেল পোস্ট
আজ শনিবার (১৭ অক্টোবর) বিশ্ব ট্রমা দিবস। দুর্ঘটনাজনিত আঘাত ও মৃত্যু কমানো এবং জরুরি চিকিৎসার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোই দিবসটির মূল লক্ষ্য। এমন দিনে দেশের মহাসড়ককেন্দ্রিক জরুরি চিকিৎসাব্যবস্থার দুর্বলতা নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
বাংলাদেশ পুলিশ ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০১৮ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। তবে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি ও রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাবে প্রকৃত প্রাণহানির সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়েও বেশি।
২০০৪-০৫ অর্থবছরে প্রথম পর্যায়ে ১০টি ট্রমা সেন্টার নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে ২০১০ সালে আরও ১৪টি কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়। কিন্তু ২৪টি কেন্দ্র নির্মিত হলেও মাত্র দুটি কেন্দ্রে সীমিত পরিসরে বহির্বিভাগের সেবা চালু রয়েছে। আরেকটি কেন্দ্র জেলা হাসপাতালের অর্থোপেডিকস বিভাগের অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিটি কেন্দ্রে ১৪ জন চিকিৎসক, ১০ জন নার্সসহ প্রয়োজনীয় কারিগরি জনবল থাকার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত জনবল নিয়োগ না হওয়ায় অধিকাংশ কেন্দ্রে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাসেবা চালু করা যায়নি। অনেক কেন্দ্রে জরুরি রোগী ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয় সরঞ্জামও নেই।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির আহ্বায়ক মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, যাত্রীদের স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করেই ট্রমা সেন্টার নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে এগুলোর কার্যক্রম শুরু হয়নি। এখন সরকার এগুলো চালুর উদ্যোগ নিচ্ছে, যা ইতিবাচক।
কিশোরগঞ্জের ভৈরব ও সুনামগঞ্জের ছাতক ট্রমা সেন্টারেও জনবলসংকটে পূর্ণাঙ্গ সেবা দেওয়া যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট জেলার সিভিল সার্জনরা জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় স্থায়ী জনবল না থাকায় কেন্দ্র দুটির কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
ফরিদপুরের ভাঙ্গায় গত নয় মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় ৫৮ জন নিহত ও তিন শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন বলে হাইওয়ে পুলিশের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। ভাঙ্গা উপজেলার সাবেক স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা: তানসিভ জুবায়ের নাদিম বলেন, দুর্ঘটনায় আহতদের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে ট্রমা সেন্টার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভাঙ্গার মতো গুরুত্বপূর্ণ সড়ক যোগাযোগকেন্দ্রে একটি ট্রমা সেন্টার চালু হলে আহতরা দ্রুত সেবা পেতেন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা: মুশতাক হোসেনের মতে, শুধু ভবন নির্মাণ করলেই হবে না; জরুরি রোগী ব্যবস্থাপনা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, রক্তক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ এবং গুরুতর রোগীদের উন্নত হাসপাতালে পাঠানোর কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি জেলা ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সঙ্গে সমন্বয় জরুরি।
দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর থাকা ট্রমা সেন্টারগুলো আধুনিকায়ন করে ‘দুর্ঘটনা ও জরুরি চিকিৎসাকেন্দ্র’ হিসেবে চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা: ফোয়ারা তাসনিম বলেন, ট্রমা সেন্টারগুলো চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। খুব দ্রুতই এগুলোর কার্যক্রম শুরু করা হবে। এ ছাড়া মহাসড়কে প্রতি ১০ কিলোমিটার পরপর অ্যাম্বুলেন্স রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন আরও কয়েকটি ট্রমা সেন্টার নির্মাণের কার্যক্রমও প্রক্রিয়াধীন।
বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর বিভিন্ন ধরনের আঘাতে প্রায় ৬০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। এসব মৃত্যুর প্রায় ৯০ শতাংশ ঘটে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে। দুর্ঘটনার পর দ্রুত প্রাথমিক চিকিৎসা, রক্তক্ষরণ বন্ধ করা এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত উন্নত হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে অনেক প্রাণ বাঁচানো সম্ভব।
বিশ্ব ট্রমা দিবসে তাই দুর্ঘটনা প্রতিরোধের পাশাপাশি জরুরি চিকিৎসাব্যবস্থা শক্তিশালী করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দেশের ২৪টি ট্রমা সেন্টার সচল করা গেলে মহাসড়কে দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের দ্রুত চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ বাড়বে, কমতে পারে প্রাণহানিও।
এমপি/ আরআই