শিরোনাম
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০২:৫১, ১৩-০৭-২০২৬ | আপডেট: ৬:১০, ৩০-০৭-২০২৬
ছবি: মেডিকেল পোস্ট
প্রতিষ্ঠানটির একাধিক বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েক দশক ধরে বৈজ্ঞানিক স্বাধীনতা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার জন্য পরিচিত আইসিডিডিআরবির সেই ঐতিহ্য সাম্প্রতিক সময়ে প্রশ্নের মুখে পড়েছে। তাদের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানের নাম ও মর্যাদা ব্যবহার করে রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার বার্তা দেওয়া হয়েছে।
২০২৪ সালের ২৭ মে ড. তাহমিদ আহমেদ গণভবনে গিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎ করেন। ওই বৈঠকে আইসিডিডিআরবির অন্য কোনো প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন না।
অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, এটি কোনো রাষ্ট্রীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক বৈঠক ছিল কি না, সে বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। বৈঠকের উদ্দেশ্য, আলোচ্যসূচি কিংবা প্রতিষ্ঠানটির জন্য কী ফল এসেছে, সেটিও স্পষ্ট করা হয়নি। এরপর ওই সাক্ষাতের ছবি ও সংক্ষিপ্ত বিবরণ প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়।
তাদের দাবি, ২০২৪ সালের নির্বাচনের পর রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল সময়ে এমন সাক্ষাৎ এবং তার প্রাতিষ্ঠানিক প্রচার আইসিডিডিআরবির আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের প্রশ্ন তৈরি করেছে।
তথ্য অনুযায়ী, ৪ জুলাই আইসিডিডিআরবিতে তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সামন্ত লাল সেন ও প্রতিমন্ত্রী রোকেয়া সুলতানাকে নিয়ে একটি বিশেষ সেমিনারের আয়োজন করা হয়।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, অনুষ্ঠানটি কোনো বড় গবেষণা প্রকাশ, বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার বা জরুরি জনস্বাস্থ্য কর্মসূচি উপলক্ষে ছিল না। এরপরও দুই মন্ত্রীর উপস্থিতি ও বক্তব্য প্রতিষ্ঠানটির অফিসিয়াল মাধ্যমে গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করা হয়।
১৪ জুলাই, যখন কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে উঠছিল, তখন আইসিডিডিআরবির সাসাকাওয়া অডিটোরিয়ামে একটি বিশেষ টাউন হল সভা অনুষ্ঠিত হয়।
নথিতে বলা হয়েছে, সভায় একমাত্র বক্তা ছিলেন ড. তাহমিদ আহমেদ। মঞ্চের বড় পর্দায় শেখ হাসিনার সঙ্গে তার গণভবনের সাক্ষাতের ছবি প্রদর্শন করা হয়। বক্তব্যে তিনি সেই সাক্ষাৎ ও শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রশংসা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে ওই অনুষ্ঠানে কর্মীদের প্রশ্ন বা মতামত দেওয়ার সুযোগ ছিল না।
নথিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ওই টাউন হলে ড. তাহমিদ আহমেদ ছিলেন একমাত্র বক্তা। অনুষ্ঠানে কর্মীদের জন্য কোনো প্রশ্নোত্তর পর্ব রাখা হয়নি এবং মতামত দেওয়ারও সুযোগ ছিল না। সমালোচকদের প্রশ্ন, একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ সভা কেন একমুখী উপস্থাপনায় সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছিল এবং শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎকে কেন বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছিল।
১৪ জুলাইয়ের টাউন হলের পর দেশের পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি ঘটে। ১৬ জুলাই রংপুরে আবু সাঈদ নিহত হন। এরপর দেশজুড়ে সংঘর্ষ, প্রাণহানি, ইন্টারনেট বন্ধ, কারফিউ এবং সেনাবাহিনী মোতায়েনের মতো ঘটনা ঘটে। এমন জাতীয় সংকটের মধ্যেই ২৫ জুলাই আইসিডিডিআরবির অফিসিয়াল ই-মেইল থেকে ১৪ জুলাইয়ের পুরো টাউন হলের ভিডিও সব কর্মীর কাছে পাঠানো হয়।
অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, দেশের এমন পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ ও তার নেতৃত্বের প্রশংসাসংবলিত ভিডিও অফিসিয়ালভাবে পুনরায় প্রচারের প্রয়োজনীয়তা কী ছিল এবং এ সিদ্ধান্ত কার নির্দেশে নেওয়া হয়েছিল।
সমালোচকদের প্রশ্ন, যখন দেশ ছাত্র আন্দোলন, প্রাণহানি, কারফিউ ও অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, তখন শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ ও তার নেতৃত্বের প্রশংসাসংবলিত ভিডিও পুনরায় প্রচারের প্রয়োজন কেন ছিল।
নথিতে বলা হয়েছে, ৩ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন 'এক দফা' ঘোষণা করে। ৪ আগস্ট দেশজুড়ে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে এবং পরদিন ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করেন। অভিযোগকারীদের মতে, এমন একটি রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেও ৪ আগস্ট প্রকাশিত আইসিডিডিআরবির নিউজ এন্ড ভিউজ এর প্রথম পাতায় ৪ জুলাইয়ের মন্ত্রীদের অনুষ্ঠান ও ১৪ জুলাইয়ের টাউন হলকে গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করা হয়, যা প্রতিষ্ঠানটির রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
সমালোচকদের মতে, শেখ হাসিনা সরকার পতনের ঠিক আগের দিনও সরকার ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ ব্যক্তিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার বিষয়কে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করা একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন।
নথিতে আরও বলা হয়েছে, ২০২১ সালে আইসিডিডিআরবির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের নিয়ে ধানমন্ডি ৩২-এ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। একই সময়ে প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন কার্যক্রমে 'মুজিব-১০০' ব্র্যান্ডিং, স্মৃতি বৃক্ষ রোপণ, স্মারক স্থাপন এবং বঙ্গবন্ধুর নামে গবেষণা অনুদান কর্মসূচিও চালু করা হয়।
সমালোচকদের দাবি, আইসিডিডিআরবির ইতিহাসে এর আগে কোনো নির্বাহী পরিচালক প্রতিষ্ঠানের অফিসিয়াল পরিচয়ে এ ধরনের রাজনৈতিক প্রতীক ব্যবহারের নজির স্থাপন করেননি। তাদের মতে, ব্যক্তিগত রাজনৈতিক বিশ্বাসের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের অফিসিয়াল অবস্থানকে এক করে দেখানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, আইসিডিডিআর,বির নীতিমালা অনুযায়ী প্রথম মেয়াদের পর দ্বিতীয় মেয়াদ নবায়নের সুযোগ থাকলেও তৃতীয় মেয়াদ ব্যতিক্রমধর্মী বিষয়। তাই তারা প্রশ্ন তুলেছেন, নতুন নির্বাহী পরিচালক নিয়োগে আন্তর্জাতিক সার্চ প্রক্রিয়া শুরু না করে কেন বর্তমান নির্বাহী পরিচালকের মেয়াদ অব্যাহত রাখার আলোচনা হচ্ছে এবং এর যৌক্তিকতা কী।
ডকুমেন্টে দাবি করা হয়েছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে গেলেও ড. তাহমিদ আহমেদ নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন এবং তৃতীয় মেয়াদে থাকার চেষ্টা করছেন।
আইসিডিডিআরবি আইনে প্রথম মেয়াদের পর দ্বিতীয় মেয়াদ নবায়নের সুযোগ থাকলেও তৃতীয় মেয়াদ সাধারণ নিয়ম নয়; ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে তা বিবেচিত হতে পারে। তাই সমালোচকদের প্রশ্ন, রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা নিয়ে অভিযোগ থাকা একজন নির্বাহী পরিচালকের ক্ষেত্রে কেন সেই ব্যতিক্রমী সুযোগের আলোচনা হচ্ছে এবং কেন স্বাভাবিক আন্তর্জাতিক নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করা হবে না।
প্রতিষ্ঠানসংশ্লিষ্টদের একাংশের মতে, বিষয়টি কোনো ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে নয় বরং আইসিডিডিআরবির প্রাতিষ্ঠানিক নিরপেক্ষতা, সুশাসন ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্ন।
তাদের দাবি, গণভবনে একান্ত সাক্ষাৎ, ১৪ জুলাইয়ের টাউন হল, ২৫ জুলাই ভিডিও প্রচার, ৪ আগস্টের নিউজ অ্যান্ড ভিউজ, ২০২১ সালের প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসূচি এবং বর্তমান নেতৃত্বের মেয়াদ—সব বিষয়ই স্বাধীনভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে তারা মনে করেন, অভিযোগগুলোর বিষয়ে নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ ও আইসিডিডিআরবি কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যও জনসমক্ষে আসা উচিত, যাতে বিষয়গুলো নিয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যায়।
এমপি/ আরআই