ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬

২৭ আশ্বিন ১৪৩৩, ২৯ রবিউস সানি ১৪৪৮

আইসিডিডিআরবিতে ক্ষমতার কেন্দ্রে কি একজনই?

স্বজনপ্রীতি, পদ সৃষ্টি করে পদায়ন, নেতৃত্বে একই মুখ—উঠছে নানা প্রশ্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০১:৪৫, ১৩-০৭-২০২৬

আইসিডিডিআরবিতে ক্ষমতার কেন্দ্রে কি একজনই?

ছবি: মেডিকেল পোস্ট

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইসিডিডিআরবির (icddr b) প্রশাসন ও নেতৃত্ব নিয়ে একের পর এক প্রশ্ন উঠছে। নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদের বিরুদ্ধে ক্ষমতা কেন্দ্রীকরণ, স্বজনপ্রীতি, গুরুত্বপূর্ণ পদে ঘনিষ্ঠদের পদায়ন, নিয়মিত পদোন্নতি ব্যবস্থা পাশ কাটিয়ে নতুন পদ সৃষ্টি এবং মেধার পরিবর্তে আনুগত্যকে গুরুত্ব দেওয়ার অভিযোগ তুলছেন প্রতিষ্ঠানের একাধিক বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা।

তাদের দাবি, কয়েক দশক ধরে বৈজ্ঞানিক স্বাধীনতা, আন্তর্জাতিক বৈচিত্র্য এবং মেধাভিত্তিক নেতৃত্বের জন্য পরিচিত প্রতিষ্ঠানটি ধীরে ধীরে ব্যক্তি-নির্ভর প্রশাসনে পরিণত হচ্ছে।

উপনির্বাহী পরিচালক নেই, বাড়তি দায়িত্ব নিজের হাতেই

আইসিডিডিআরবির সাংগঠনিক কাঠামোয় নির্বাহী পরিচালকের পাশাপাশি উপনির্বাহী পরিচালকের পদ রয়েছে। এই পদের দায়িত্ব হলো নির্বাহী পরিচালককে সহায়তা করা এবং প্রয়োজন হলে তার অনুপস্থিতিতে দায়িত্ব পালন করা। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, ড. তাহমিদ আহমেদের পুরো মেয়াদে এ পদটি পূরণের দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বরং পদটি শূন্য রেখে তিনি নিজেই নির্বাহী দায়িত্বের পাশাপাশি একাধিক বৈজ্ঞানিক ডিভিশনের দায়িত্ব নিজের কাছে রেখেছেন।

প্রশ্ন উঠেছে, প্রতিষ্ঠানের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদ বছরের পর বছর শূন্য থাকলেও কেন সেটি পূরণ করা হয়নি? এটি কি প্রশাসনিক প্রয়োজন, নাকি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা নিজের হাতে রাখার কৌশল?

নির্বাহী পরিচালক হয়েও প্রায় চার বছর ছাড়েননি নিজ বিভাগের দায়িত্ব

ড. তাহমিদ আহমেদ নির্বাহী পরিচালক হওয়ার আগে নিউট্রিশন রিসার্চ ডিভিশনের জ্যেষ্ঠ পরিচালক ছিলেন। ২০২১ সালে নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর স্বাভাবিক নিয়মে ওই বিভাগের দায়িত্ব অন্য কোনো জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানীর কাছে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি প্রায় তিন বছর নয় মাস একই সঙ্গে নির্বাহী পরিচালক এবং ওই ডিভিশনের ভারপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, ওই সময়ে ড. জোবায়ের চিশতী ও ড. মুনিরের মতো আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত বিজ্ঞানীরা ডিভিশনে কর্মরত ছিলেন। এ কারণে প্রশ্ন উঠেছে—যোগ্য উত্তরসূরি তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন নাকি যোগ্য ব্যক্তি থাকা সত্ত্বেও দায়িত্ব নিজের কাছেই রেখেছিলেন?

হেলথ সিস্টেমস ডিভিশনেও একই চিত্র

নিউট্রিশন রিসার্চ ডিভিশনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে হেলথ সিস্টেমস অ্যান্ড পপুলেশন স্টাডিজ ডিভিশনেও। ডিভিশনটির জ্যেষ্ঠ পরিচালক অধ্যাপক সারা সালওয়ে দায়িত্ব ছাড়ার পর ভারপ্রাপ্ত পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন ড. তাহমিদ আহমেদ।

অভিযোগকারীদের দাবি, ওই ডিভিশনে তখন ড. গোলাম শরফুল ইসলাম খানের মতো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী কর্মরত ছিলেন। তারপরও কেন নির্বাহী পরিচালক নিজেই দায়িত্ব নিলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সমালোচকদের মতে, এতে ক্ষমতা কেন্দ্রীকরণের প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়েছে।

স্ত্রীকে গুরুত্বপূর্ণ ডিভিশনের দায়িত্ব

ইনফেকশাস ডিজিজেস ডিভিশনের জ্যেষ্ঠ পরিচালকের আকস্মিক মৃত্যুর পর ভারপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয় ড. তাহমিদ আহমেদের স্ত্রীকে।

অভিযোগকারীরা বলছেন, এখানে মূল প্রশ্ন তার ব্যক্তিগত যোগ্যতা নয় বরং কর্মরত নির্বাহী পরিচালকের স্ত্রীকে একই প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বের দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত কীভাবে মোকাবিলা করা হয়েছিল।

ড. তাহমিদ কি সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন? অন্য জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানীদের মূল্যায়ন করা হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। পরে সমালোচনার মুখে তাকে সরিয়ে অন্য একজনকে ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরবর্তীতে তিনিই পূর্ণাঙ্গ জ্যেষ্ঠ পরিচালক হন। তবে অভিযোগ রয়েছে, সেই নিয়োগেও মেধা ও প্রতিযোগিতার চেয়ে ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতাই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।

মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য বিভাগেও বিতর্ক

ম্যাটারনাল অ্যান্ড চাইল্ড হেলথ ডিভিশনের জ্যেষ্ঠ পরিচালক অবসরে যাওয়ার পর ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব দেওয়া হয় ড. তাহমিদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত একজনকে। অভিযোগ রয়েছে, ওই ব্যক্তি অবসরের বয়সসীমা অতিক্রম করেছিলেন। একই সময়ে বিভাগে আরও একজন জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী কর্মরত ছিলেন, যার গবেষণা প্রকাশনা, তহবিল সংগ্রহ, নীতিনির্ধারণী অবদান এবং পদক্রম তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী ছিল।

তাই প্রশ্ন উঠেছে, নেতৃত্ব নির্বাচনে কি সবার জন্য একই মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়েছে, নাকি ব্যক্তি ভেদে নিয়ম বদলেছে?

মানবসম্পদ বিভাগে পরিচালকের বদলে উপদেষ্টা

প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ (এইচআর) বিভাগের পরিচালক পদ শূন্য হওয়ার পর নিয়মিত পদক্রম অনুসরণ না করে একজন উপদেষ্টাকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ড. মোশাররফ হোসেন উপদেষ্টা হলেও নিয়োগ, পদোন্নতি, কর্মী ব্যবস্থাপনা এবং অন্যান্য সংবেদনশীল মানবসম্পদ সিদ্ধান্তে পরিচালক পর্যায়ের প্রভাব বিস্তার করতেন।

সমালোচকদের প্রশ্ন, তার আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব কতটুকু ছিল এবং মানবসম্পদ-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে তার ক্ষমতার সীমা কোথায় ছিল?

তিনজনের জন্য তিনটি নতুন পদ?

ড. তাহমিদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো, অ-বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তাদের নিয়মিত পদোন্নতি ব্যবস্থা এড়িয়ে তার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত তিন কর্মকর্তার জন্য নতুন বা উচ্চতর পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। রেগুলেটরি অ্যান্ড লিগ্যাল অ্যাফেয়ার্স, রিসার্চ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন এবং কমিউনিকেশনস বিভাগে নতুন পদ তৈরি করে পরে অভ্যন্তরীণ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে তাঁদের নিয়োগ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে তাদের আগের পদগুলো আর পূরণ করা হয়নি বরং বিলুপ্ত হয়ে যায়।

এতে প্রশ্ন উঠেছে, পদগুলো কি প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনেই সৃষ্টি হয়েছিল, নাকি আগে ব্যক্তি নির্ধারণ করে পরে পদ তৈরি করা হয়েছিল?

গবেষণা অভিজ্ঞতা ছাড়াই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব?

রিসার্চ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিভাগের নেতৃত্ব নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার শিক্ষাগত পটভূমি ব্যবসা প্রশাসন ও সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থাপনায়। জনস্বাস্থ্য গবেষণায় তার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি, গবেষণা প্রকল্প পরিচালনার অভিজ্ঞতা কিংবা আন্তর্জাতিক পিয়ার-রিভিউড জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা নেই। এরপরও তাকে আইসিডিডিআরবির মতো প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা প্রশাসনের দায়িত্ব দেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।

কেন চলে গেলেন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা?

ড. তাহমিদ আহমেদের মেয়াদকালে অধ্যাপক অ্যালেন রস, অধ্যাপক ড্যানিয়েল ডি. রিডপাথ, অধ্যাপক সারা মারিয়া সালওয়ে এবং অর্থ বিভাগের প্রধান আবদাল্লা আহমেদ আব্বাসসহ একাধিক আন্তর্জাতিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা প্রতিষ্ঠান ছেড়ে গেছেন।

অভিযোগকারীদের মতে, প্রত্যেকের বিদায়ের কারণ আলাদা হলেও এতজন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞের ধারাবাহিক প্রস্থান একটি সতর্ক সংকেত। তাদের ভাষ্য, এসব কর্মকর্তার পদত্যাগপত্র, বিদায়ী সাক্ষাৎকার ও মানবসম্পদ নথি পর্যালোচনা করলে অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যেতে পারে।

স্বাধীন তদন্তের দাবি

প্রতিষ্ঠানের ভেতরের অনেক কর্মকর্তা মনে করেন, গুরুত্বপূর্ণ ভারপ্রাপ্ত নিয়োগ, স্ত্রী-সম্পর্কিত পদায়ন, নতুন পদ সৃষ্টি, মানবসম্পদ বিভাগের সিদ্ধান্ত এবং আন্তর্জাতিক কর্মকর্তাদের প্রস্থান—সব বিষয় নিয়ে একটি স্বাধীন তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

তাদের মতে, আইসিডিডিআর,বি কোনো ব্যক্তির প্রতিষ্ঠান নয়; এটি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। তাই প্রতিষ্ঠানটির নেতৃত্ব, স্বচ্ছতা ও মেধাভিত্তিক সংস্কৃতি রক্ষায় স্বাধীন পর্যালোচনা জরুরি।

এমপি/ আরআই

আরও পড়ুন