ঢাকা, শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬

২২ কার্তিক ১৪৩৩, ২৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮

জিয়াউদ্দিন হায়দার

স্বাস্থ্যব্যবস্থা সংস্কারে সমন্বিত পরিকল্পনা সরকারের

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৬:৩৯, ০৬-১১-২০২৬

স্বাস্থ্যব্যবস্থা সংস্কারে সমন্বিত পরিকল্পনা সরকারের

ছবি: মেডিকেল পোস্ট

দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে সমন্বিত, আধুনিক, জনবান্ধব ও আর্থিকভাবে সুরক্ষিত করতে ব্যাপক সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণের পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে সরকার। স্বাস্থ্য খাতে অর্থায়ন, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, হাসপাতালের সক্ষমতা বৃদ্ধি, বিশেষায়িত চিকিৎসা সম্প্রসারণ এবং আধুনিক চিকিৎসাপ্রযুক্তির ব্যবহারে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এস. এম. জিয়াউদ্দিন হায়দার।

শুক্রবার (৬ নভেম্বর) রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচেম বাংলাদেশ) আয়োজিত স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাপ্রযুক্তিবিষয়ক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, বর্তমান সরকারের লক্ষ্য বিদ্যমান চিকিৎসাকেন্দ্রিক ব্যবস্থাকে পর্যায়ক্রমে প্রতিরোধমুখী, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাভিত্তিক, সমন্বিত ও রোগীকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থায় রূপান্তর করা। এ জন্য অর্থায়ন, স্বাস্থ্যকর্মী, অবকাঠামো, চিকিৎসাপ্রযুক্তি, ওষুধ ও রোগনির্ণয় ব্যবস্থা, রেফারেল সেবা এবং চিকিৎসার গুণগত মান—সব ক্ষেত্রেই সমন্বিত উন্নয়ন প্রয়োজন।

তিনি বলেন, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও জেলা হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এতে সাধারণ মানুষকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার জন্য রাজধানী বা বড় শহরে ছুটতে হবে না। পাশাপাশি আঞ্চলিক পর্যায়ে বিশেষায়িত চিকিৎসা, কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় গড়ে তোলা হবে।

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য শুধু হাসপাতালের সংখ্যা বৃদ্ধি বা আধুনিক যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করা নয়; বরং এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে একজন রোগী সময়মতো সঠিক রোগনির্ণয়, উপযুক্ত চিকিৎসা, প্রয়োজনীয় ফলোআপ এবং আর্থিক সুরক্ষা পাবেন। স্বাস্থ্যব্যবস্থার সফলতা পরিমাপ করতে হবে রোগীর চিকিৎসার ফলাফল ও জীবনমানের উন্নয়নের ভিত্তিতে।’

স্বাস্থ্য খাতে অর্থায়নের সংকট তুলে ধরে তিনি বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বাংলাদেশের মোট চলতি স্বাস্থ্যব্যয়ের প্রায় ৭৯ শতাংশ এসেছে ব্যক্তিগত বা নিজস্ব পকেটের ব্যয় থেকে। ক্যান্সার, হৃদ্‌রোগ, কিডনি রোগসহ জটিল অসংক্রামক রোগের চিকিৎসার ব্যয় অনেক পরিবারকে আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেয়। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারি অর্থায়নের কার্যকারিতা বৃদ্ধি, সম্পদের দক্ষ ব্যবহার, আর্থিক ঝুঁকি সুরক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবা ক্রয়ের আধুনিক পদ্ধতি চালুর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে আধুনিক প্রাক্‌-হাসপাতাল জরুরি চিকিৎসাসেবা ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী। তিনি বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা, হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোক ও গুরুতর আঘাতের ক্ষেত্রে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করা জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য আধুনিক অ্যাম্বুলেন্স নেটওয়ার্ক, প্রশিক্ষিত প্যারামেডিক ও জরুরি চিকিৎসাকর্মী, কেন্দ্রীয় যোগাযোগব্যবস্থা এবং হাসপাতালভিত্তিক রেফারেল সেবার সমন্বয়ে জাতীয় জরুরি চিকিৎসাসেবা কাঠামো গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে।

বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবায় বেসরকারি খাতের সক্ষমতা কাজে লাগানোর আহ্বান জানিয়ে ড. হায়দার বলেন, স্ট্র্যাটেজিক পারচেজিং পদ্ধতিতে নির্ধারিত মান, সেবার গুণগত মান, স্বচ্ছ মূল্য নির্ধারণ ও জবাবদিহির ভিত্তিতে বেসরকারি হাসপাতাল থেকে চিকিৎসাসেবা কেনা যেতে পারে। বিশেষ করে ক্যান্সার, হৃদ্‌রোগ ও কিডনি ডায়ালাইসিসের মতো ব্যয়বহুল চিকিৎসায় এ ব্যবস্থা দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর আর্থিক সুরক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে।

তিনি বলেন, ‘বেসরকারি খাতে যেখানে ইতোমধ্যে বিশেষায়িত চিকিৎসার সক্ষমতা রয়েছে, সেখানে উপযুক্ত নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহির মাধ্যমে সেই সক্ষমতাকে জনগণের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত রোগীর চিকিৎসার সুযোগ বৃদ্ধি করা এবং চিকিৎসাব্যয়ের কারণে পরিবারগুলোকে আর্থিক বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করা।’

দেশে চিকিৎসাযন্ত্র ও স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি উৎপাদনের শিল্প গড়ে তোলার সম্ভাবনা তুলে ধরে তিনি বলেন, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব, বিদেশি বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং দেশীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে এ খাতের বিকাশ সম্ভব। এতে আমদানিনির্ভরতা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় কমার পাশাপাশি কর্মসংস্থান এবং রপ্তানির সুযোগ তৈরি হবে। তবে চিকিৎসাযন্ত্রের মান নিয়ন্ত্রণ, নিবন্ধন, দক্ষ জনবল তৈরি এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।

স্বাস্থ্য পর্যটনের সম্ভাবনা তুলে ধরে ড. হায়দার বলেন, উন্নত ও বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য প্রতিবছর অনেক বাংলাদেশি বিদেশে যান। দেশে আন্তর্জাতিক মানের বিশেষায়িত চিকিৎসাকেন্দ্র, দক্ষ জনবল, উন্নত রোগনির্ণয় ব্যবস্থা ও মানসম্মত হাসপাতাল গড়ে তোলা গেলে বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়ার প্রবণতা কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব ও স্বীকৃতির মাধ্যমে বাংলাদেশকে প্রতিবেশী দেশগুলোর রোগীদের জন্য আকর্ষণীয় স্বাস্থ্য পর্যটন গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে।

চিকিৎসাপ্রযুক্তিতে বিনিয়োগের সুফল পেতে দক্ষ জনবল তৈরি, চিকিৎসাসেবার মান নিয়ন্ত্রণ এবং যন্ত্রপাতির কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। এ জন্য চিকিৎসক, নার্স, বায়োমেডিকেল প্রকৌশলী ও টেকনিশিয়ানদের প্রশিক্ষণ এবং হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয়, পেশাজীবী সংগঠন ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, স্বাস্থ্য খাতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের সফলতা শুধু বিনিয়োগের পরিমাণ দিয়ে বিচার করা যাবে না। রোগীর চিকিৎসার ফলাফল, সেবার নিরাপত্তা, চিকিৎসার ধারাবাহিকতা, ব্যয় সাশ্রয় এবং জনগণের সন্তুষ্টির ভিত্তিতে এর মূল্যায়ন করতে হবে।

ড. হায়দার বলেন, স্বাস্থ্য খাতের নীতি নির্ধারণ, সেবার মান নিয়ন্ত্রণ, ন্যায্যতা ও জনস্বার্থ রক্ষার প্রধান দায়িত্ব সরকারের। অন্যদিকে বেসরকারি খাত বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন, দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও বিশেষায়িত সেবা সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখতে পারে। এ সহযোগিতা যেন শুধু বাণিজ্যিক সুযোগ সৃষ্টি না করে বরং সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবার প্রাপ্যতা, মান ও আর্থিক সুরক্ষায় বাস্তব উন্নতি ঘটায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার রূপান্তরে সরকার নেতৃত্ব দেবে, কিন্তু এই রূপান্তর সফল করতে বেসরকারি খাত, উন্নয়ন সহযোগী, চিকিৎসাপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের সম্মিলিত অংশগ্রহণ অপরিহার্য। আমাদের লক্ষ্য এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা, যেখানে মানসম্মত চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ একজন মানুষের আয়, সামাজিক অবস্থান বা বসবাসের স্থানের ওপর নির্ভর করবে না।’

সেমিনারে অ্যামচেম বাংলাদেশের সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল, মার্কিন দূতাবাসের প্রতিনিধি, সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, স্বাস্থ্য খাতের নীতিনির্ধারক, চিকিৎসাবিশেষজ্ঞ এবং বেসরকারি হাসপাতাল ও চিকিৎসাপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন জাতীয় হৃদ্‌রোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা: আবদুল ওয়াদুদ চৌধুরী, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক ডা: মো. আক্তার হোসেন, মেডট্রনিক বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর মায়াঙ্ক ত্রিপাঠী এবং স্কয়ার হাসপাতালসের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট মিনহাজ উদ্দিন সুলতান।

এমপি/ আরআই

আরও পড়ুন