শিরোনাম
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৩:৫৯, ২৭-১০-২০২৬
ছবি: মেডিকেল পোস্ট
যশোরের হিজড়া সম্প্রদায়ের সদস্যদের অভিযোগ, মেডিকেল সনদের জন্য সিভিল সার্জন কার্যালয়ে আবেদন করার পর একাধিক পরীক্ষা করতে বলা হয়। এর মধ্যে মাত্র দুটি পরীক্ষা যশোরে করা যায়। বাকি ৮ থেকে ১০টি পরীক্ষার জন্য যেতে হয় রাজধানীর বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় অথবা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।
হিজড়া সম্প্রদায়ের সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, যশোর শহরসহ জেলার আটটি উপজেলায় তাদের হিসাবে পাঁচ শতাধিক হিজড়ার বসবাস। তবে এর বাইরে আরও অনেকে রয়েছেন। তাদের মধ্যে মাত্র ১১৮ জন সমাজসেবা অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত। তালিকাভুক্তদের মধ্যে নিয়মিত ভাতা পান ৮২ জন। তারা মাসে ৬০০ টাকা করে ভাতা পান।
ভাতাভোগীদের মধ্যে যশোর পৌর এলাকায় ২১ জন, সদর উপজেলায় ৯ জন, ঝিকরগাছায় ২০ জন, শার্শায় ১২ জন, কেশবপুরে ১৫ জন, মণিরামপুরে ১৩ জন, অভয়নগরে ১৩ জন, বাঘারপাড়ায় ১০ জন ও চৌগাছায় ৫ জন রয়েছেন। ২০২৫ সালের নভেম্বরের আগ পর্যন্ত সরকারি ভাতা পেতে হিজড়াদের বয়স ৫০ বছর হতে হতো। দীর্ঘদিনের দাবি ও বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে বয়সসীমা কমিয়ে শিশুকাল নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে বিষয়টি এখনো প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
ভুক্তভোগীরা জানান, মেডিকেল পরীক্ষার প্রথম ধাপে চিকিৎসক, নার্স এবং কখনো কখনো সমাজসেবা কর্মকর্তাদের সামনে বিবস্ত্র হয়ে পরীক্ষা দিতে হয়। এ অভিজ্ঞতাকে তারা অপমানজনক ও তিক্ত বলে উল্লেখ করেছেন। তাদের অধিকাংশই পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন এবং চরম দরিদ্র। ফলে ঢাকায় যাতায়াতসহ একাধিক ব্যয়বহুল পরীক্ষা করানো তাদের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে।
হিজড়াদের নিয়ে কাজ করা উন্নয়ন সংস্থা অর্পণ মানব কল্যাণ সংস্থার সমন্বয়ক রুবাইদুল হক সুমন বলেন, যশোরের প্রায় সব হিজড়াই দরিদ্র। ফলে এতগুলো ব্যয়বহুল মেডিকেল টেস্টের জন্য ঢাকায় যাতায়াতসহ আনুষঙ্গিক ব্যয় বহন করার সামর্থ্য নেই। হাতেগোনা দু-চার জন ছাড়া। এছাড়া পরিধেয় বস্ত্র সরিয়ে যেভাবে মেডিকেল টেস্ট করা হয় তা অপমানজনক ও তিক্ত অভিজ্ঞতার জন্ম দেয়।
প্রতি জেলায় মেডিকেল বোর্ড গঠনের দাবি জানিয়ে সুমন বলেন, সরকারি নীতিমালায় আছে সিভিল সার্জন অফিস একটি মেডিকেল বোর্ড করবে, যাচাই বাছাই করে মেডিকেল সনদ দিয়ে দেবে। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন জেলা শহরে হিজড়া গুরুরাও শনাক্ত করে প্রত্যয়ন দেবেন। এভাবে প্রক্রিয়াটি করা গেলে হিজড়াদের জন্য অনেক সহজ হয়ে যায়।
হিজড়াদের দাবি আদায়ের বিভিন্ন কর্মসূচিতে ভূমিকা রাখা গোলাম মোস্তফা নীল বলেন, আমাকে মেডিকেল টেস্ট করতে গিয়ে হয়রানির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। সাতটি টেস্ট দেওয়া হয়েছিল। অত্যন্ত ব্যয়বহুল এ টেস্টগুলোর সব যশোরেও করা যায়নি। দুটি যশোরে করতে পেরেছি, বাকি টেস্টের জন্য ঢাকায় যেতে হয়েছে। অধিকাংশ হিজড়া দরিদ্র হওয়ায় তারা মেডিকেল টেস্ট করতে চান না। ফলে সনদ না থাকাতে সরকারি সুযোগ সুবিধা বঞ্চিতই থাকছেন আমাদের কমিউনিটির মানুষ।
ফাবিহা বুশরার অভিজ্ঞতাও সুখকর নয়। তিনি বলেন, মেডিকেল টেস্ট করতে গিয়ে অত্যন্ত তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছে, যা বলে বোঝাতে পারব না। প্রয়োজনীয় টেস্ট ছাড়া অন্যান্য টেস্ট যদি কমানো যায়, আর ধাপগুলো যদি সহজ করা যায়, তাহলে আমাদের জন্য ভালো হয়। শুধুমাত্র এই একটি জায়গায় আটকে থাকার কারণে আমরা এ দেশের নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও সরকারি সমস্ত সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত রয়েছি। তাই মেডিকেল টেস্টের ধাপটি সহজ করার দাবি জানান তিনি।
সেলিম হোসেন বিজয় বলেন, যশোরের অধিকাংশ হিজড়াই দরিদ্র, তাই সবাই ভাতা পেতে চেষ্টা করেন। কিন্তু মেডিকেল সনদের জটিলতায় অল্প কিছু হিজড়া সরকারি ভাতা পান। ৬০০ টাকার এ ভাতা নিশ্চিত করতে গিয়ে হিজড়াদের যতটা বেগ পেতে হয়, তাতে অন্য সুযোগ সুবিধার কথা বাদই দিলাম। আমাদের যতটা প্রয়োজন তার বেশি টেস্ট দেওয়াটা অমানবিক, কারণ সবাই সামর্থ্যবান না। ৭-৮টি বা ১০-১২টি ব্যয়বহুল মেডিকেল টেস্ট করার সামর্থ্য অধিকাংশ দরিদ্র হিজড়ারই থাকে না, আর এটি করতে গিয়ে তাদের তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়।
তবে স্বাস্থ্য বিভাগের বক্তব্য, মেডিকেল সনদ দিতে কিছু অত্যাবশ্যকীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা প্রয়োজন। যশোরের সিভিল সার্জন ডা: মাসুদ রানা বলেন, হিজড়াদের মেডিকেল সনদ পাওয়ার জন্য কিছু অত্যাবশ্যকীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। জেন্ডার ও হরমোনাল বিষয় নিশ্চিত করতে এসব পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন হয়। এগুলো ছাড়া মেডিকেল সনদ প্রদান সম্ভব নয়। আর মেডিকেল টেস্টের অধিকাংশ প্রক্রিয়া রাজধানীভিত্তিক হওয়ায় স্থানীয়ভাবে তা সহজ করার সুযোগ সীমিত।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, যেহেতু এই পরীক্ষা একবারই করতে হয়, তাই কষ্ট করে হলেও প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে সনদ নেওয়া উচিত। সেক্ষেত্রে হিজড়াদের যেসব সংগঠন আছে, তারা কেন্দ্রীয়ভাবে পরীক্ষার ফি কমানো এবং প্রক্রিয়াকে সহজতর করার জন্য আলোচনার উদ্যোগ নিতে পারে। সেক্ষেত্রে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের যেকোনো নির্দেশনাই তারা যথাযথভাবে প্রতিপালন করবেন।
এমপি/ আরআই