শিরোনাম
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১১:০১, ২৭-১০-২০২৬
ছবি: মেডিকেল পোস্ট
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সকাল থেকে রাত পর্যন্ত হাসপাতালজুড়ে এ পরিস্থিতি দেখা যায়।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, সকাল থেকে জরুরি বিভাগের গেট, কলেজ গেট, নতুন ভবনসহ আশপাশের এলাকায় অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও অনেক চালক রোগী পরিবহন করেননি। কেউ চার-পাঁচ ঘণ্টা, আবার কেউ সাত-আট ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অ্যাম্বুলেন্স পাননি। এতে ঢাকার বাইরে থেকে আসা রোগী এবং স্বজন হারানো পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ে।
নারায়ণগঞ্জের মো. শাহীন তার ৭০ বছর বয়সী দাদি হালিমা বেগমকে সোমবার ঢামেক হাসপাতালের নতুন ভবনের মেডিসিন বিভাগে ভর্তি করান। দুপুর সাড়ে ৩টার দিকে তিনি মারা যান। মরদেহ নিয়ে মাওয়ায় যাওয়ার জন্য তিন ঘণ্টার বেশি সময় অপেক্ষা করেও অ্যাম্বুলেন্স পাননি শাহীন। পরে সন্ধ্যা ৭টার দিকে চানখারপুল মোড় থেকে পিকআপ ভ্যান ভাড়া করে দাদির মরদেহ নিয়ে রওনা হন তিনি।
শাহীন বলেন, সরকারি হাসপাতালে এসেও এমন বিপদে পড়তে হবে তা কখনো ভাবেননি। দাদি মারা যাওয়ার পর তিন ঘণ্টার বেশি সময় ধরে অ্যাম্বুলেন্স খুঁজেও পাইনি। সরকারি অ্যাম্বুলেন্সও চোখে পড়েনি। এ পরিস্থিতির দায় সরকার ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে।
একই ধরনের ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রাবাড়ীর মোহাম্মদ মনির হোসেন। তার ২২ বছর বয়সী বড় ভাগিনা মো. রাসেল পেটে ব্যথা নিয়ে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে ঢামেকে আনা হয়। নতুন ভবনের মেডিসিন বিভাগে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বিকেল ৫টার দিকে রাসেল মারা যান। এরপর মরদেহ নিয়ে যাওয়ার জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও অ্যাম্বুলেন্স পাননি মনির।
তিনি জানান, হাসপাতালের একজন চিকিৎসক তাদের ভ্যানে করে মরদেহ নিয়ে যেতে বলেছেন।
অন্যদিকে, গুরুতর আহত শাশুড়িকে নিয়ে খুলনা থেকে ঢামেক হাসপাতালে আসেন আব্দুল আহাদ। পরে তার শাশুড়িকে কিডনি হাসপাতালে পাঠানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। দুপুর থেকে অন্য হাসপাতালে নেওয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্স খুঁজেও পাননি তিনি।
আহাদ বলেন, সরকারি অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া যাচ্ছে না, কেউ কোনো সমাধানও দিতে পারছেন না। গুরুতর অসুস্থ রোগীকে নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হচ্ছে।
ঢামেক হাসপাতাল বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. শাহাদাত হোসেন জানান, হাসপাতালের নতুন পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম মো. ফরহাদ হোসেন দায়িত্ব নেওয়ার পর হাসপাতাল থেকে তাদের সব অ্যাম্বুলেন্স বের করে দেওয়া হয়। পরে নতুন ভবনের নিচে পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করতে তাদের দিয়ে জায়গাটি পরিষ্কার করানো হয়। সেখানে সিসি ক্যামেরা, লাইট ও গেট স্থাপন করা হলেও পরবর্তী সময়ে সেখান থেকেও গাড়ি সরিয়ে দেওয়া হয়।
শাহাদাত হোসেন বলেন, রাস্তায় অ্যাম্বুলেন্স রাখলে পুলিশের সার্জেন্ট মামলা দেন। হাসপাতালে পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করতে তারা কয়েক লাখ টাকা খরচ করেছেন। এমন পরিস্থিতিতে নিরুপায় হয়ে পার্কিংয়ের দাবিতে ধর্মঘট পালন করছেন। নতুন ভবনের নিচে নির্ধারিত জায়গায় প্রতিটি গাড়ির বিপরীতে সরকারকে রাজস্ব দিতেও তারা রাজি। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত ধর্মঘট চলবে বলে জানান তিনি।
ঢামেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগের আবাসিক সার্জন মোস্তাক আহমেদ বলেন, সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত রোগীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসিয়ে রাখা হলেও তাদের নেওয়া হয়নি। পরে শাহবাগ থানাকে বিষয়টি জানিয়ে সহযোগিতা চাওয়া হয়। এরপর বাইরের যেকোনো অ্যাম্বুলেন্স হাসপাতালে প্রবেশ করে রোগী নিতে পারবে বলে ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে এরই মধ্যে রোগী ও স্বজনদের বড় ধরনের ভোগান্তি হয়েছে।
তিনি বলেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অ্যাম্বুলেন্সচালক, মালিক সমিতি কিংবা অ্যাপসভিত্তিক সেবার বিপক্ষে নয়। তারা চান, ভাড়া যৌক্তিক হোক এবং অ্যাম্বুলেন্সের অ্যাপ, চালক ও সিরিয়ালসহ সবকিছু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হোক।
সরকারি অ্যাম্বুলেন্সের সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে মোস্তাক আহমেদ বলেন, সরকারি অ্যাম্বুলেন্সে মরদেহ এবং ঢাকার বাইরে রোগী পরিবহন করা হয় না। ঢাকার মধ্যে রোগী পরিবহনের জন্যও অ্যাম্বুলেন্সের সংখ্যা কম। তাই সীমিত পরিসরে রোগী পরিবহন করা হচ্ছে। বুধবারের মধ্যে এ বিষয়ে ভালো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
পার্কিং নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির বিরোধে দিনভর দুর্ভোগ পোহাতে হয় সাধারণ মানুষকে। রোগী স্থানান্তর ও মরদেহ পরিবহনে এমন সংকট এড়াতে দুই পক্ষের মধ্যে দ্রুত সমঝোতা এবং কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এমপি/ আরআই