শিরোনাম
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১২:০৫, ২৯-১০-২০২৬ | আপডেট: ১২:২০, ২৯-১০-২০২৬
ছবি: মেডিকেল পোস্ট
রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে নারীর মরদেহের সঙ্গে বিকৃত যৌনাচারের অভিযোগ নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। ২০২৫ সালের নভেম্বর ও ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে দুটি নারীর মরদেহের পরীক্ষায় পুরুষের শুক্রাণুর উপস্থিতি পাওয়ার তথ্য সামনে এসেছে। এ ঘটনাগুলো ঘিরে মর্গের নিরাপত্তাব্যবস্থা, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের ভূমিকা এবং অতীতের অনুরূপ অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন থানা ও আশুলিয়া এলাকার মরদেহের ময়নাতদন্ত করা হয় এই হাসপাতালের মর্গে। কোনো মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করতে কিংবা আইনি প্রক্রিয়া শেষ করতে সময় লাগলে সেগুলো হিমঘরে সংরক্ষণ করা হয়। কিন্তু মৃতদেহ সংরক্ষণের জন্য নির্ধারিত এই জায়গায় অনিয়ম ও অপরাধের অভিযোগ সামনে আসায় সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন এলাকার একটি বাড়ি থেকে উদ্ধার করা এক নারীর মরদেহ মর্গে নেওয়া হয়। ময়নাতদন্তে মৃত্যুর স্বাভাবিকতার কথা উল্লেখ থাকলেও পরবর্তী ফরেনসিক পরীক্ষা ও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ে মরদেহটিতে পুরুষের শুক্রাণুর উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়।
এর আগে ২০২৫ সালের নভেম্বরেও আরেক নারীর মরদেহের পরীক্ষায় একাধিক পুরুষের শুক্রাণুর উপস্থিতি পাওয়ার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ঘটনায় মর্গের তৎকালীন ডোম ও কর্মচারীদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ সামনে আসে।
সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মর্গে এ ধরনের অভিযোগ এর আগেও উঠেছিল। ২০১৯ সালে মুন্না ভগত নামে মর্গের এক সহকারী বা ডোমের বিরুদ্ধে একাধিক মরদেহের সঙ্গে বিকৃত যৌনাচারের প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়েছিল সিআইডি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মুন্না ছিলেন তৎকালীন মর্গ ইনচার্জ যতনলালের ভাগ্নে এবং তার মাধ্যমেই মুন্নার নিয়োগ হয়েছিল। ওই ঘটনায় যতনলাল গ্রেফতার হলেও পরে জামিনে মুক্তি পান।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে মর্গের সহকারী নূরে আলম শান্ত ও তৎকালীন মর্গ ইনচার্জ যতনলালসহ কয়েকজনের নাম অভিযোগের সঙ্গে উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজ নষ্ট হয়ে যাওয়ার কথাও বলা হয়েছে। পাশাপাশি, চিকিৎসকদের কেউ কেউ অনিয়মের প্রতিবাদ করলে তাদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং তদন্তের সর্বশেষ অবস্থা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
ঢাকার বাইরেও বিভিন্ন সময়ে একই ধরনের অভিযোগ সামনে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২১ সালে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং ২০২৫ সালে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গেও কর্মচারীদের বিরুদ্ধে এ ধরনের অপরাধের প্রমাণ পাওয়ার তথ্য রয়েছে।
মৃতদেহের প্রতি যৌন আকর্ষণ বা মৃতদেহকে কেন্দ্র করে যৌন আচরণকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নেক্রোফিলিয়া বলা হয়। এটি অস্বাভাবিক যৌন আচরণের একটি ধরন হিসেবে বিবেচিত।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ডা: মো. আজিজুল ইসলাম এ বিষয়ে বলেন, ‘তাদের মধ্যে এক ধরনের চরম একাকীত্ব, বর্জনের ভয় এবং হীনম্মন্যতা কাজ করে। তারা মনে করে, জীবিত কোনো মানুষের সাথে সম্পর্ক করতে গেলে তারা প্রত্যাখ্যাত হবে। অন্যদিকে মৃত মানুষ কোনো প্রতিবাদ করবে না এবং সম্পূর্ণ তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে- এই ফ্যান্টাসি থেকেই তারা এই অপরাধে লিপ্ত হয়।’
অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, মৃতদেহের সঙ্গে যৌনাচারের মতো অপরাধের বিচার নিশ্চিত করতে প্রচলিত আইনের প্রয়োগ ও প্রাসঙ্গিক বিধানের বিষয়টি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। অপরাধের ধরন অনুযায়ী কোন আইনি বিধান প্রযোজ্য হবে, তা স্পষ্ট করা এবং তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের শনাক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ।
আইনজীবীদের মতে, মৃতদেহের সঙ্গে যৌন অপরাধের সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা ও শাস্তির বিধান যুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে হাসপাতালের মর্গ ও মরদেহ সংরক্ষণের স্থানগুলোতে সার্বক্ষণিক সিসিটিভি ক্যামেরা, প্রবেশ-প্রস্থান নথিভুক্তকরণ এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
মৃত্যুর পর একজন মানুষের নিজের মর্যাদা রক্ষা বা কোনো অন্যায়ের প্রতিবাদ করার সুযোগ থাকে না। তাই মরদেহের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কেবল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, এটি মানবিক মর্যাদা ও আইনের শাসন রক্ষারও অংশ। অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, যথাযথ নজরদারি এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমেই মর্গের নিরাপত্তা নিয়ে মানুষের উদ্বেগ দূর করা সম্ভব।
এমপি/ আরআই