ঢাকা, রোববার, ০১ নভেম্বর ২০২৬

১৭ কার্তিক ১৪৩৩, ২০ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮

চিকিৎসার জন্য জমানো ৭০ হাজার টাকা পুড়ে ছাই

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০২:৫৪, ০১-১১-২০২৬

চিকিৎসার জন্য জমানো ৭০ হাজার টাকা পুড়ে ছাই

ছবি: মেডিকেল পোস্ট

পায়ের চিকিৎসা করিয়ে সুস্থ হওয়ার আশায় ছিলেন ২১ বছর বয়সী মো. শোয়াইবুল ইসলাম রাকিব। চিকিৎসার জন্য সকালে বাড়ি থেকে বের হওয়ার কথা ছিল তার। কিন্তু তার আগেই আগুনে পুড়ে গেছে ঘর। বিছানার বালিশের নিচে রাখা ৭০ হাজার টাকাও রক্ষা করতে পারেননি তিনি। দুইটি বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) থেকে নেওয়া ঋণের কিস্তি পরিশোধের জন্য জমিয়েছিলেন সেই টাকা। এখন চিকিৎসার খরচ জোগানো ও ঋণের কিস্তি পরিশোধ—দুই নিয়েই অনিশ্চয়তায় পড়েছেন রাকিব।

গতকাল (৩১ অক্টোবর) দিবাগত রাত দেড়টার দিকে চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার খাসখামা গ্রামের আলী মিয়ার বাড়িতে এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে তিনটি বসতঘর পুড়ে যায়।

ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের দাবি, সব মিলিয়ে তাদের প্রায় ৯ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। তবে ফায়ার সার্ভিসের প্রাথমিক হিসাবে, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় আড়াই লাখ টাকা।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাত ১টা ২০ মিনিটের দিকে আগুনের সূত্রপাত হয়। প্রথমে স্থানীয় লোকজন বালতি ও বিভিন্ন সরঞ্জাম দিয়ে পানি ঢেলে আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন। আগুনের তীব্রতা বাড়তে থাকলে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করে ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেওয়া হয়। পরে ফায়ার সার্ভিসের একটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।

আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত নজরুল ইসলাম ওরফে সোনা মিয়ার ছেলে রাকিব বলেন, ‘আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। সকালে চিকিৎসার জন্য বের হওয়ার কথা ছিল। দুইটি এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছিলাম। কিস্তি পরিশোধের জন্য প্রায় ৭০ হাজার টাকা জমিয়েছিলাম। সেই টাকা বিছানার বালিশের নিচে রাখা ছিল। হঠাৎ গরম অনুভব হওয়ায় ঘুম থেকে উঠে দেখি, আগুনের লেলিহান শিখা। বাইরে থেকেও আগুন আগুন বলে চিৎকার শুনতে পাই। এরপর ঘর থেকে বের হয়ে আর ভেতরে ঢুকতে পারিনি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমার ঘরে টাকাসহ সব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। এখন কীভাবে চিকিৎসা করব, কীভাবে কিস্তির টাকা পরিশোধ করব? আমার বাবা নেই। অনেক কষ্টে আমরা দুই ভাই বড় হয়েছি। আমরা এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চাই।’

ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগুনে জামাল উদ্দীন আহমদের ঘরের প্রায় ৫০ আড়ি ধান, ৭০ হাজার টাকা ও আসবাবপত্র পুড়ে গেছে। এতে প্রায় চার লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি তার। নজরুল ইসলাম ওরফে সোনা মিয়ার বসতঘরও পুড়ে গেছে। তার পরিবারের দাবি, এতে প্রায় এক লাখ টাকার আসবাবপত্র নষ্ট হয়েছে। অন্যদিকে আবুল মনসুরের ঘরের আসবাবপত্রসহ প্রায় চার লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

রাকিবের ভাই আকিবের অভিযোগ, আগুন লাগার আগে তাদের বাড়িতে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন পাশের কয়েকজন। এ নিয়ে রাতেই ৯৯৯ নম্বরে ফোন করলে আনোয়ারা থানার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) সহিদুল ইসলামসহ পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে যায়। পুলিশ দুই পক্ষকে শান্ত করে এবং রোববার সকাল ১১টায় থানায় গিয়ে বিষয়টি সমাধানের পরামর্শ দেয়।

আকিব বলেন, ‘আমার চাচা-জেঠারা কেউ এখানে থাকেন না। আমিও শহরে থাকি। ঘটনার রাতে আমাদের বাড়িতে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। রাত দেড়টার দিকে আমার চাচাতো ভাই আবুল মনসুরের ঘরের পূর্ব পাশ থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। তাদের ঘর দুটি পুড়ে যাওয়ার পর আমাদের ঘরেও আগুন ছড়িয়ে পড়ে। আমার ছোট ভাই রাকিব প্রথম আগুন দেখতে পায়। সব মিলিয়ে আমাদের প্রায় নয় লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। আমরা চাই, সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার বিচার হোক। আমার ভাইয়েরা শহর থেকে এলে থানায় গিয়ে অভিযোগ করব।’

এদিকে আগুনে পার্শ্ববর্তী আবুল কালামের ঘরেরও কিছু অংশ পুড়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ঘরের বিদ্যুতের মিটারও। আবুল কালাম বলেন, ‘আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। কারা আগুন লাগিয়েছে, তা দেখিনি। তবে আগুনে আমার ঘরের কিছু অংশ ও মিটার পুড়ে গেছে। আমি এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই।’

ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, খবর পেয়ে দিবাগত রাত পৌনে দুইটার দিকে একটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নেভানোর কাজ শুরু করে। প্রায় ৪৫ মিনিটের চেষ্টায় আগুন পুরোপুরি নির্বাপণ করা হয়। ক্ষতিগ্রস্ত তিনটি ঘরের মধ্যে একটি সেমিপাকা, একটি বেড়ার এবং অন্যটি মাটির তৈরি। প্রাথমিকভাবে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করছে ফায়ার সার্ভিস।

আনোয়ারা ফায়ার স্টেশনের লিডার মো. মুজিবুর রহমান বলেন, ‘খবর পেয়ে আমাদের একটি ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে যায়। আগুনের লেলিহান শিখার মধ্যেই আমাদের কর্মীরা নির্বাপণের কাজ শুরু করেন। ৪৫ মিনিটের মধ্যে আগুন পুরোপুরি নির্বাপণ করতে সক্ষম হই। এতে আনুমানিক আড়াই লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে এবং প্রায় ১০ লাখ টাকার মালামাল উদ্ধার করা হয়েছে।’

এমপি/ আরআই

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন