ঢাকা, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬

১ কার্তিক ১৪৩৩, ০৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮

কফি অ্যানেমা নিয়ে সতর্ক করলেন বিশেষজ্ঞরা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৭:৫২, ৩১-০৮-২০২৬

কফি অ্যানেমা নিয়ে সতর্ক করলেন বিশেষজ্ঞরা

ছবি: মেডিকেল পোস্ট

‘কফি অ্যানেমা’ নামে বিকল্প চিকিৎসা পদ্ধতির প্রচার ও ব্যবহার নিয়ে সতর্ক করেছেন পরিপাকতন্ত্র ও লিভার বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, পায়ুপথে কফি ও পানির মিশ্রণ প্রবেশ করিয়ে শরীর ‘ডিটক্স’ করার দাবির কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই বরং এ পদ্ধতিতে পরিপাকতন্ত্রে গুরুতর ক্ষতি হতে পারে এবং এটি প্রাণঘাতীও হতে পারে।

মূলত মলাশয় বা কোলন পরিষ্কারের একটি বিকল্প প্রক্রিয়া হিসেবে ‘কফি অ্যানেমা’র প্রচলন হয়েছে। এতে রেকটাম বা পায়ুপথের মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত কফি ও পানির মিশ্রণ শরীরে প্রবেশ করানো হয়। প্রচারকদের দাবি, এর মাধ্যমে শরীর থেকে ক্ষতিকর উপাদান বের করে দেওয়া বা ‘ডিটক্সিফিকেশন’ করা সম্ভব।

সম্প্রতি ডা: জাহাঙ্গীর কবিরসহ কয়েকজন চিকিৎসক কফি অ্যানেমার প্রচারে সোচ্চার হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত বাংলাদেশি চিকিৎসক অধ্যাপক ডা: মুজিবুল হক এবং বিদেশে অবস্থানরত আরেক বাংলাদেশি চিকিৎসক ডা: মুজিবুর রহমানও এ পদ্ধতির প্রচারে রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রচারকদের দাবি, পায়ুপথে কফি প্রবেশ করালে এতে থাকা ক্যাফেইন ও থিওফিলিন অন্ত্রের শিরা হয়ে সরাসরি লিভারে পৌঁছায় এবং ‘গ্লুটাথিয়ন এস-ট্রান্সফারেজ’ বা জিএসটি নামের ডিটক্স এনজাইমের উৎপাদন প্রায় ৭০০ শতাংশ বাড়িয়ে দেয়। এতে লিভার ও রক্ত দ্রুত বিষমুক্ত হয় বলেও দাবি করা হয়।

তবে লিভার, পরিপাকতন্ত্র ও অগ্ন্যাশয় রোগ এবং মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের কনসালট্যান্ট ডা: মো. আরিফুর রহমান বলেন, “কফি অ্যানেমা দ্বারা উপকারের কোনো বৈজ্ঞানিক ও গবেষণালব্ধ প্রমাণ নেই। মূলধারার চিকিৎসা বিজ্ঞানে কফি অ্যানেমার কোনো স্থান নেই।”

কফি অ্যানেমার অকার্যকারিতা তুলে ধরে তিনি বলেন, “অনেকে দাবি করেন এটি লিভার পরিষ্কার করে বা বিষাক্ত পদার্থ শরীর থেকে বের করে দেয়। অথচ মানবদেহে লিভার ও কিডনি প্রাকৃতিকভাবেই ২৪ ঘণ্টা ডিটক্সিফিকেশনের কাজ সম্পাদন করে। মলদ্বার দিয়ে কফি ঢোকানের মাধ্যমে ‘ডিটক্স’ করার মতো অবৈজ্ঞানিক ধারণার কোনো ফিজিওলজিক্যাল যৌক্তিকতা নেই।”

তিনি বলেন, কফি অ্যানেমা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ একটি প্রক্রিয়া। গরম কফির দ্রবণ মলদ্বারের সংবেদনশীল মিউকোসা স্তরে পোড়া ক্ষত তৈরি করতে পারে। নলের মাধ্যমে জোরপূর্বক দ্রবণ প্রবেশ করানোর সময় কোলন বা মলদ্বার ফুটো হয়ে যেতে পারে। বারবার অ্যানেমা ব্যবহারে সোডিয়াম ও পটাশিয়ামের মতো প্রয়োজনীয় খনিজের ভারসাম্যও নষ্ট হতে পারে। পটাশিয়ামের মাত্রা হঠাৎ কমে গেলে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ বা কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট পর্যন্ত হতে পারে।

ইবনে সিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা: রিয়াজ উদ্দিন দানেশ বলেন, “অনেকেই হোম ট্রিটমেন্টের মতো করে কফি অ্যানেমা ব্যবহার করেন। কিন্তু এটার কোনো সায়েন্টিফিক এভিডেন্স নাই। বরঞ্চ এটা উল্টা দেখা গেছে যে এটা হার্মফুল।”

তিনি জানান, সম্প্রতি কফি অ্যানেমার কারণে বিভিন্ন ক্ষত নিয়ে রোগীরা হাসপাতালে আসছেন। এর মধ্যে পরিপাকতন্ত্র পুড়ে যাওয়া, রক্তক্ষরণ ও মলাশয় ফুটো হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনাও রয়েছে।

ডা: রিয়াজ উদ্দিন দানেশ বলেন, “আপনি একটা একটা ওষুধ কখন খাবেন? যখন আপনার জীবনে কোনো বেনিফিট হওয়ার চান্স বেশি থাকবে। প্রত্যেক ওষুধেরই একটা সাইড ইফেক্ট থাকতে পারে। কিন্তু আমরা দেখি বেনিফিটটা বেশি কিনা। বেনিফিটের চাইতে ক্ষতির দিক যদি বেশি হয়, তাহলে সাধারণ বিবেকই বলে এটা আসলে একসেপ্ট করা যায় না।”

তিনি জানান, কয়েকদিন আগে রাজধানীর জাতীয় গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে একজন রোগী পায়ুপথে প্রচুর রক্তক্ষরণ নিয়ে আসেন। পরে পরীক্ষায় তার পরিপাকতন্ত্রের ভেতরে পোড়া ও ক্ষতবিক্ষত অবস্থা পাওয়া যায়। চিকিৎসকরা জানতে পারেন, ওই ব্যক্তি কফি অ্যানেমা নিচ্ছিলেন। সংকটাপন্ন অবস্থায় তাকে হাসপাতালে আনা হয়েছিল বলে জানান ডা: রিয়াজ উদ্দিন দানেশ।

এদিকে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) রেজিস্ট্রার ডা: মো. লিয়াকত হোসেন বলেন, “এই ধরনের চর্চা আগে কখনো ছিল না। ইদানিং কিছু কিছু চিকিৎসকের বরাত দিয়ে সামনে আসছে। কাজেই যারা এক্সপার্ট গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট, তারা যে কথাটি বলেছে যে এটা একেবারেই অবৈজ্ঞানিক, আমাদেরও সেই বক্তব্য।”

তিনি বলেন, “আমরা সব সময় এটা বলেই আসি যে চিকিৎসকদের নৈতিকতা ঠিক রেখে চিকিৎসাসেবা পরিচালনা করতে হবে। সে ক্ষেত্রে সাধারণত চিকিৎসাসেবা পরিচালনা যদি অনৈতিকতার মধ্যে পড়ে, তবে সেটা প্রমাণ সাপেক্ষে অবশ্যই শাস্তিযোগ্য অপরাধ।”

সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশে চিকিৎসক ও চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান বিএমডিসি। বিএমডিসি আইন, ২০১০-এ সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ ওষুধ প্রেসক্রাইবের ক্ষেত্রে শাস্তির বিধান রয়েছে। আর ওষুধ নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের (ডিজিডিএ) কাছে। তবে কফি অ্যানেমা দেশে নতুনভাবে আলোচনায় আসায় এটি ওষুধ হিসেবে গণ্য হয়নি এবং নিষিদ্ধও নয়।

কফি অ্যানেমার প্রচারণা নিয়ে ডা: আরিফুর রহমান বলেন, এটিকে যৌনাচার হিসেবে চিহ্নিত করে মূল সমস্যা থেকে নজর সরিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। তার মতে, এটি অল্টারনেটিভ মেডিসিন বা কুচিকিৎসার অংশ হিসেবে ছড়ানো হয়েছে।

এ বিষয়ে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বক্তব্য জানতে চেষ্টা করেও ডা: জাহাঙ্গীর কবির ও অধ্যাপক ডা: মুজিবুল হকের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তাদের টিমের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এমপি/ আরআই

আরও পড়ুন