শিরোনাম
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০২:৫৫, ০৯-০৮-২০২৬
ছবি: মেডিকেল পোস্ট
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) সম্প্রতি ‘মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) ২০২৫’ প্রকাশ করে। ইউনিসেফ এতে কারিগরি সহায়তা দিয়েছে। সারা দেশের ২৩ হাজারের বেশি শিশুর শারীরিক পরিমাপের ভিত্তিতে জরিপটি পরিচালিত হয়েছে।
খর্বাকৃতি বলতে বয়স অনুযায়ী বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ডের তুলনায় কোনো শিশুর উল্লেখযোগ্যভাবে খাটো হওয়াকে বোঝায়। এটি দীর্ঘস্থায়ী অপুষ্টির অন্যতম প্রধান নির্দেশক। বিশেষ করে জীবনের প্রথম এক হাজার দিনে পুষ্টির ঘাটতির প্রভাব শিশুর শারীরিক ও মস্তিষ্কের বিকাশে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
জরিপে দেখা গেছে, দরিদ্র পরিবারের শিশুদের খর্বাকৃতির ঝুঁকি ধনী পরিবারের শিশুদের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারের শিশুদের মধ্যে এ হার ৩২ দশমিক ৩ শতাংশ, যেখানে সবচেয়ে ধনী পরিবারের ক্ষেত্রে ১৬ দশমিক ১ শতাংশ। শহরের তুলনায় গ্রামের শিশুরা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের মধ্যেও এ সমস্যা কিছুটা বেশি।
গত তিন দশকে দেশে খর্বাকৃতির হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ১৯৯৭ সালে এ হার ছিল ৫৯ দশমিক ৬ শতাংশ, যা ২০২৫ সালে কমে ২৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তবে ২০ থেকে ৩০ শতাংশের মধ্যে খর্বাকৃতির হারকে ‘উচ্চ প্রকোপ’ হিসেবে বিবেচনা করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। ফলে বাংলাদেশ এখনো এ শ্রেণিতে রয়েছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগের অধ্যাপক তাজউদ্দীন সিকদার বলেন, শিশুদের খর্বাকৃতির পেছনে দীর্ঘস্থায়ী অপুষ্টি, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, পরিবেশদূষণ ও শারীরিক কর্মকাণ্ডের সুযোগের অভাব একসঙ্গে কাজ করছে। ঘনবসতিপূর্ণ শহরাঞ্চলে খেলার মাঠ কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ইউনিসেফের ১৬৩টি দেশের সর্বশেষ তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, খর্বাকৃতির হারের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান ৪৯তম। আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও ভারতের তুলনায় বাংলাদেশের পরিস্থিতি ভালো হলেও শ্রীলঙ্কা, ভুটান ও মালদ্বীপের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে।
খর্বাকৃতির প্রভাব শুধু শিশুর উচ্চতায় সীমাবদ্ধ নয়। এসব শিশু তীব্র শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ ও ডায়রিয়ার মতো রোগে বেশি আক্রান্ত হতে পারে এবং শৈশবেই তাদের মৃত্যুঝুঁকি বাড়ে। একই সঙ্গে মস্তিষ্কের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়া, জ্ঞানীয় সক্ষমতা কমে যাওয়া ও শেখার গতি ধীর হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
জরিপে দেখা গেছে, ৭ থেকে ১৪ বছর বয়সী ১০ শিশুর মধ্যে ছয়জন বয়স-উপযোগী একটি সহজ গল্পের অন্তত ৯০ শতাংশ শব্দ সঠিকভাবে পড়তে পারে। তবে প্রাথমিক গণনাগত দক্ষতা দেখাতে পেরেছে মাত্র ৪০ শতাংশ শিশু।
শৈশবের খর্বাকৃতির প্রভাব প্রাপ্তবয়স্ক জীবনেও পড়তে পারে। বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণা অনুযায়ী, খর্বাকৃতিতে ভোগা ব্যক্তিরা অন্যদের তুলনায় গড়ে প্রায় ২০ শতাংশ কম আয় করেন। তাদের দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাসের সম্ভাবনা প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি এবং দক্ষ কর্মসংস্থান পাওয়ার সম্ভাবনাও কম।
গবেষকেরা বলছেন, খর্বাকৃতির সমস্যা শিশুর জন্মের আগেই শুরু হতে পারে। বাংলাদেশে প্রায় অর্ধেক নারী ১৮ বছর বয়সের আগেই বিয়ে করেন এবং প্রতি চারজনের একজন কৈশোরেই অন্তঃসত্ত্বা হন। এতে মা ও শিশু উভয়ের পুষ্টিজনিত ঝুঁকি বাড়ে।
জরিপে আরও দেখা গেছে, ৬ থেকে ২৩ মাস বয়সী প্রায় তিন শিশুর মধ্যে দুইজন প্রয়োজনীয় খাদ্যগোষ্ঠীর পর্যাপ্ত খাবার পায় না। অর্ধেকের বেশি শিশুকে প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়ানো হয়, প্রতি পাঁচ শিশুর একজন চিনিযুক্ত পানীয় পান করে এবং এক-তৃতীয়াংশ শিশু কোনো ফল বা সবজি পায় না।
খর্বাকৃতির সমস্যা মোকাবিলায় কারণগুলো নিয়ে গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানো, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে দেশব্যাপী সচেতনতা তৈরি এবং শিশুদের জন্য স্কুলে খেলার মাঠ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন অধ্যাপক তাজউদ্দীন সিকদার। তার মতে, সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার জন্য পুষ্টির পাশাপাশি শিশুদের পর্যাপ্ত শারীরিক কর্মকাণ্ডের সুযোগও নিশ্চিত করা জরুরি।
এমপি/ আরআই