ঢাকা, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬

১ কার্তিক ১৪৩৩, ০৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮

আলহাজ্ব আব্দুর রাজ্জাক নার্সিং কলেজ

১৫৮ শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষক মাত্র একজন

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৪:১৫, ১৬-১০-২০২৬

১৫৮ শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষক মাত্র একজন

ছবি: মেডিকেল পোস্ট

শরীয়তপুরের ডামুড্যায় প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত আলহাজ্ব আব্দুর রাজ্জাক নার্সিং কলেজে শিক্ষকসংকট ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের সীমিত সুযোগে ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষা কার্যক্রম। চার ব্যাচের ১৫৮ শিক্ষার্থীর পাঠদানের দায়িত্বে রয়েছেন মাত্র একজন শিক্ষক। সাতটি ল্যাবের মধ্যে চালু রয়েছে মাত্র একটি। প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষকের অভাবে বাকি ছয়টি ল্যাব ব্যবহার করা যাচ্ছে না।

২০২৩ সালে ডামুড্যা উপজেলার দক্ষিণ ডামুড্যা এলাকায় পাঁচ একর জমির ওপর কলেজটি নির্মাণ করা হয়। বর্তমানে চার ব্যাচে ১৫৮ শিক্ষার্থী এখানে পড়াশোনা করছেন। শিক্ষকসংকটের কারণে একাধিক ব্যাচের ক্লাস নেওয়া, নির্ধারিত সময়ে পাঠ্যসূচি শেষ করা এবং শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় একাডেমিক দিকনির্দেশনা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রয়োজনে অধ্যক্ষকেও ক্লাস নিতে হচ্ছে।

কলেজের একমাত্র শিক্ষক অসিমা রানী সরকার ২২টি বিষয়ের পাঠদান করছেন। তিনি বলেন, ‘২২টি সাবজেক্টের জন্য আমি একজন মাত্র শিক্ষক। পাশাপাশি অধ্যক্ষও ক্লাস নেন। সাতটি ল্যাবের জন্য আলাদা শিক্ষক থাকার প্রয়োজন অথচ এখানে শিক্ষকও নেই, আবার প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদিও নেই। আমরা যেভাবে এতগুলো ক্লাস নিই, সেটি শুধু নামেই ক্লাস। এখান থেকে যেসব শিক্ষার্থী বের হবে, তারা দক্ষ নার্স হিসেবে গড়ে উঠতে পারবে না।’

এদিকে, নার্সিং শিক্ষায় তাত্ত্বিক জ্ঞানের পাশাপাশি ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে কলেজটির সাতটি ল্যাবের মধ্যে মাত্র একটি চালু রয়েছে। প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষকের অভাবে বাকি ল্যাবগুলো ব্যবহার করা যাচ্ছে না। এতে ব্যবহারিক জ্ঞান ও পেশাগত দক্ষতা অর্জন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থীরা।

তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী অর্পিতা দাস বলেন, ‘আমাদের ২২টি সাবজেক্ট, অথচ শিক্ষক একজন ও অধ্যক্ষ একজন। আমাদের বিষয়গুলো সব ইংরেজিতে। একজন শিক্ষকের কাছ থেকে আমরা কতটুকু শিক্ষা পাব, সেটাই চিন্তার বিষয়। এভাবে আমরা নিজেরা নিজেরা পড়াশোনা করে কতদূর এগোতে পারব, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন।’

শিক্ষার্থী মাহিমা আক্তার বলেন, নার্সিং শিক্ষায় ব্যবহারিক জ্ঞান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজনীয় ল্যাবগুলো সচল না থাকায় প্রশিক্ষণের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। এতে ভবিষ্যতে পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন হবে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। দ্রুত শিক্ষকসংকট নিরসন করে সব ল্যাব সচল করার দাবি জানান তিনি।

শিক্ষার্থী আফসানা আক্তার বলেন, ‘আমরা যদি ল্যাবের ক্লাসগুলো না পাই, তাহলে শুধু পাঠ্যবই পড়ে কতটুকু জ্ঞান অর্জন করতে পারব? আমরা অন্য নার্সিং কলেজ থেকে পিছিয়ে আছি। এমনকি এখানে ৫০ শয্যার হাসপাতাল থাকায় ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণ থেকেও আমরা বঞ্চিত হচ্ছি। এখান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেও আমরা পুরোপুরি দক্ষ নার্স হিসেবে গড়ে উঠতে পারব কি না, তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।’

কলেজ চালুর পর কয়েক বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো চালু হয়নি ইন্টিগ্রেটেড বাজেট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টিং সিস্টেম (আইবাস)। কলেজ কর্তৃপক্ষের দাবি, আইবাস কোড চালু না হওয়ায় সরকারি বরাদ্দ পাওয়া ও আর্থিক কার্যক্রম পরিচালনায় জটিলতা তৈরি হয়েছে। বন্ধ রয়েছে শিক্ষাবৃত্তিও। ফলে শিক্ষা ও আবাসিক ব্যয় মেটাতে আর্থিক চাপে পড়ছেন শিক্ষার্থীরা।

শিক্ষার্থী দিলরুবা দীপা বলেন, ‘আমরা সরকারি নার্সিং কলেজে ভর্তি হয়েছি সরকারি খরচে পড়াশোনা করার জন্য। অথচ আমাদের আইবাস এখনও চালু হয়নি। বেসরকারি নার্সিং কলেজের মতোই আমাদেরও খরচ হচ্ছে। বাসা থেকে টাকা এনে খরচ চালাতে হচ্ছে। আমরা চাই, দ্রুত আইবাস চালু হোক।’

অপরদিকে, শিক্ষা কার্যক্রমের পাশাপাশি আবাসিক সুবিধা নিয়েও সমস্যায় রয়েছেন শিক্ষার্থীরা। তাদের অভিযোগ, হোস্টেলে গ্যাস ও পানির সংকট রয়েছে। পর্যাপ্ত নিরাপত্তাকর্মী না থাকায় নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন তারা। প্রয়োজনীয় অন্যান্য জনবলেরও ঘাটতি রয়েছে।

শিক্ষার্থী আদিবা আক্তার বলেন, ‘আমাদের কলেজ ও হোস্টেলে কোনো নিরাপত্তাপ্রহরী নেই। যেকোনো সময় বহিরাগত লোকজন প্রবেশ করতে পারে। আমরা অনিরাপদ পরিবেশে পড়াশোনা করছি। এতে মানসিকভাবেও সব সময় দুশ্চিন্তায় থাকি। আমরা চাই, কলেজটিতে প্রয়োজনীয় জনবল দেওয়া হোক।’

আলহাজ্ব আব্দুর রাজ্জাক নার্সিং কলেজের অধ্যক্ষ (অতিরিক্ত দায়িত্ব) জাহিদ হোসেন বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানটি চালুর পর জনবলের পদ সৃজন ও আইবাস কোড চালু হয়নি। নিরাপত্তাব্যবস্থা এমনকি পরিচ্ছন্নতাকর্মী না থাকায় আমরা খুব কষ্টের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করে যাচ্ছি। আমরা বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। তারা সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন।’

এমপি/ আরআই

আরও পড়ুন