ঢাকা, রোববার, ০১ নভেম্বর ২০২৬

১৭ কার্তিক ১৪৩৩, ২০ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮

সাইবার বুলিং-হুমকি

চাকরি ছাড়তে চান ‘মানবিক চিকিৎসক’ খ্যাত ডা: জয়নাল

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৭:১৮, ০১-১১-২০২৬

চাকরি ছাড়তে চান ‘মানবিক চিকিৎসক’ খ্যাত ডা: জয়নাল

ছবি: মেডিকেল পোস্ট

সাইবার বুলিং ও প্রাণনাশের হুমকির মুখে চাকরি ছাড়ার আবেদন করেছেন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা: জয়নাল আবেদিন মুহুরী। তার অনুপস্থিতিতে দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসা নেওয়া শিশু রোগী ও স্বজনেরা পড়েছেন বিপাকে। ‘মানবিক চিকিৎসক’ হিসেবে পরিচিত এই চিকিৎসককে আবার কর্মস্থলে নিয়মিত ফেরানোর দাবি জানিয়েছেন রোগী ও সহকর্মীরা।

জানা গেছে, গত ৭ সেপ্টেম্বর চাকরি ছাড়ার লিখিত আবেদন জমা দেন ডা: জয়নাল। তবে কর্তৃপক্ষ তাকে অব্যাহতি দেয়নি; আবেদনটি পুনর্বিবেচনার জন্য রাখা হয়েছে। এরপর থেকে তিনি নিয়মিত হাসপাতালে যাচ্ছেন না।

ফটিকছড়ির অসংখ্য অসহায় রোগীর কাছে ডা: জয়নাল শুধু চিকিৎসক নন, ভরসার মানুষ। তার তত্ত্বাবধানে থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত প্রায় ২৫০ জন রোগী রয়েছেন। তাদের মধ্যে ৩৭ জনকে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছেন তিনি। জেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সও এ কাজে সহযোগিতা করে।

এমনই একজন রোগী ১৪ বছর বয়সী সাখাওয়াত হোসেন মাহিন। পাঁচ বছর বয়সে তার থ্যালাসেমিয়া ধরা পড়ে। এরপর থেকে প্রতি মাসে রক্ত নিতে হয় তাকে। বাবাহীন মাহিনের চিকিৎসার দায়িত্ব কাঁধে নেওয়া মা বিলকিস আক্তারের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন ডা: জয়নাল। প্রতি মাসে রক্ত নেওয়ার জন্য প্রায় ১ হাজার ৮০০ টাকা খরচসহ ওষুধ কেনার ক্ষেত্রেও সহযোগিতা করতেন তিনি।

মাহিনের মা বিলকিস আক্তার বলেন, ‘ডা. জয়নাল স্যার আছেন বলেই মাহিনের চিকিৎসা করাতে পেরেছি। এখন তিনি হাসপাতালে আসেন না, তাই খুব কষ্টে পড়েছি। মোবাইল ফোনে তার পরামর্শ নিয়েই মাহিনের চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছি।’

এদিকে, হাসপাতালের বহির্বিভাগে প্রতিদিন ৭০০ থেকে ৮০০ রোগী চিকিৎসা নেন। তাদের প্রায় ১০ শতাংশ শিশু। অর্থাৎ প্রতিদিন ৭০ থেকে ৮০টি শিশু চিকিৎসা নিতে আসে। উপজেলায় সরকারি পর্যায়ে শিশুদের চিকিৎসায় বিশেষজ্ঞ হিসেবে মূল ভরসা ছিলেন ডা: জয়নাল।

শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ হলেও তিনি সব ধরনের রোগী দেখতেন। রোগীদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা দিতেন না। অসহায় রোগীদের কখনো কখনো নিজের পকেট থেকেও আর্থিক সহায়তা করতেন। করোনা মহামারির সময়ও চিকিৎসাসেবা দিয়ে গেছেন তিনি। একপর্যায়ে নিজে আক্রান্ত হলেও সুস্থ হয়ে আবার রোগীদের সেবায় ফিরে আসেন।

দীর্ঘদিন তার চিকিৎসা নিয়ে উপকৃত হওয়া মো. আলী বলেন, ‘এই ডাক্তারের চিকিৎসা আর ওষুধে আল্লাহ সন্তানকে সুস্থ রেখেছেন। আমি নামাজ পড়ে ওনার জন্য দোয়া করি, যেন তিনি ভালো থাকেন, এভাবে মানুষের সেবা করতে পারেন।’

চিকিৎসা নিতে এসে ডা: জয়নালকে না পেয়ে হতাশ হয়েছেন শাকিলা জাহান। তিনি বলেন, ‘উনি না থাকায় আমাদের অনেক সমস্যা হচ্ছে। উনার আচরণ খুব ভালো। আমরা চাই তিনি আবার স্বপদে ফিরে আসুন।’

রোগী ও সহকর্মীদের দাবির মুখে ডা: মুহুরীকে আবার নিয়মিত হাসপাতালে ফিরিয়ে আনার আশ্বাস দিয়েছেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা: মো. তৌহিদুল আলম।

তিনি বলেন, ‘মানবিক চিকিৎসক হিসেবে তিনি উপজেলায় পরিচিত। এটা স্বাস্থ্যসেবার জন্য দৃষ্টান্ত। কিন্তু সাইবার বুলিং ও ব্যক্তিগত আক্রমণে তার মতো একজন চিকিৎসক হেরে গেলে সেটা আমাদের জন্য অশনিসংকেত। কর্তৃপক্ষ তার আবেদন পুনর্বিবেচনার জন্য রেখেছে।’

চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা: মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান বলেন, ‘সাইবার বুলিং ও প্রাণনাশের হুমকির বিষয়টি প্রশাসন ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তারা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন।’

তিনি জানান, রোগী ও সহকর্মীদের অনুরোধের পর ডা: মুহুরী শিগগিরই তার সিদ্ধান্ত জানাবেন।

চাকরিতে ফিরবেন কি না, জানতে চাইলে ডা: জয়নাল আবেদিন মুহুরী বলেন, ‘আমার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, সহকর্মী, রোগী আর অসংখ্য শুভাকাঙ্ক্ষী স্বপদে ফিরতে অনুরোধ করেছেন। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে এখনো ভাবিনি। আশা করছি, একদিন সবার শুভবুদ্ধির উদয় হবে।’

এমপি/ আরআই

আরও পড়ুন