ঢাকা, রোববার, ০১ নভেম্বর ২০২৬

১৭ কার্তিক ১৪৩৩, ২০ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা

১০ বিষয় মানলে ৮০ শতাংশ স্ট্রোক প্রতিরোধ সম্ভব

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৭:৪২, ০১-১১-২০২৬

১০ বিষয় মানলে ৮০ শতাংশ স্ট্রোক প্রতিরোধ সম্ভব

ছবি: মেডিকেল পোস্ট

ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণসহ ১০টি স্বাস্থ্যবিষয়ক অভ্যাস মেনে চললে ৮০ শতাংশ স্ট্রোক প্রতিরোধ করা সম্ভব বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা। তবে স্ট্রোক হলে দ্রুত, বিশেষ করে চার ঘণ্টার মধ্যে রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা শুরু করা জরুরি। এতে দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক অক্ষমতা ও পুনর্বাসনের ব্যয় অনেকটাই কমানো সম্ভব।

রোববার (১ নভেম্বর) রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে বিশ্ব স্ট্রোক দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে বিশেষজ্ঞরা এসব কথা বলেন।

ল্যাবএইড কার্ডিয়াক হাসপাতালের নিউরোলজিস্ট অধ্যাপক মো. শহীদুল্লাহ স্ট্রোক প্রতিরোধে ১০টি বিষয় মেনে চলার পরামর্শ দেন। এগুলো হলো—ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ; ধূমপান ও অ্যালকোহল বর্জন; সপ্তাহে অন্তত পাঁচ দিন ৩০ থেকে ৪০ মিনিট হাঁটা; অতিরিক্ত ওজন কমানো; সুষম খাবার খাওয়া; মানসিক চাপ পরিহার এবং হৃদ্‌রোগ থাকলে যথাযথ চিকিৎসা নেওয়া।

অধ্যাপক শহীদুল্লাহ বলেন, স্ট্রোকের এসব ঝুঁকির অধিকাংশই বাংলাদেশে বিদ্যমান। ফাস্ট ফুড বা জাঙ্ক ফুড খাওয়ার অভ্যাসের কারণে অল্প বয়সীদের মধ্যেও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ছে।

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের (এনআইএনএস) নিউরোলজি বিভাগের সাবেক প্রধান ও সিএমএইচের ভিজিটিং প্রফেসর মালিহা হাকিম বলেন, বেসরকারি হাসপাতালে স্ট্রোকের চিকিৎসা ব্যয়বহুল। তাই সাধারণ মানুষের জন্য সরকারি পর্যায়ে চিকিৎসাসেবা সহজলভ্য করতে হবে। দেশে অঞ্চলভিত্তিক অন্তত একটি করে থ্রম্বোলাইসিস সেন্টার প্রতিষ্ঠা, স্বাস্থ্যবিমা চালু এবং ফিজিও রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার গড়ে তোলা প্রয়োজন।

নারীদের স্ট্রোকের ঝুঁকি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘নারীদের ক্ষেত্রে স্ট্রোকের জন্য ওরাল কন্ট্রাসেপটিভ পিল, গেস্টেশনাল ডায়াবেটিস, প্রি–একলাম্পসিয়া, একলাম্পসিয়া এবং পোস্ট–মেনোপজাল হরমোনাল থেরাপি, ওবেসিটি ও মেটাবলিক সিন্ড্রোম খুবই গুরুত্বপূর্ণ রিস্ক ফ্যাক্টর। এসব বিষয় নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তরুণদের মধ্যেও স্ট্রোকের ব্যাপকতা এখন বাড়ছে। তরুণদের মধ্যে অ্যালকোহল ও অ্যাবিউজার যাতে না হয়, সেদিকে নজর দিতে হবে। এ জন্য সচেতনতা তৈরি করতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোক এক বিষয় নয়—এ বিষয়ে সচেতনতা প্রয়োজন। স্ট্রোকবিষয়ক গবেষণায় বাংলাদেশ পিছিয়ে রয়েছে। রোগীর স্বার্থে গবেষকদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) জাহিদ রায়হান সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরে বলেন, প্রান্তিক মানুষের চিকিৎসায় সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। পর্যায়ক্রমে সবাইকে ই-হেলথ কার্ড দেওয়া হবে। এতে রোগীর সব তথ্য সংরক্ষিত থাকবে এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) সঙ্গে যুক্ত থাকবে। সঠিক রেফারেল ব্যবস্থা ও ই-টিকেটিংয়ের মাধ্যমে চিকিৎসাব্যবস্থার উন্নয়ন সম্ভব হবে।

এনআইএনএসের নিউরোলজি বিভাগের অধ্যাপক মো. মাহবুবুল আলম বলেন, চল্লিশের পর বয়স বাড়ার সঙ্গে স্ট্রোকের ঝুঁকিও বাড়ে। তবে জাঙ্ক ফুড গ্রহণের কারণে স্থূলতা বাড়ায় তরুণদের মধ্যেও এ ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। জাতীয় সমীক্ষা অনুযায়ী, জীবনযাপন পদ্ধতির কারণে দেশের প্রতি চারজনের একজনের স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ঝুঁকি কমাতে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ধূমপান ও তামাক বর্জন জরুরি।

এনআইএনএসের সহকারী অধ্যাপক মো. নূর উদ্দিন (রনি) বলেন, স্ট্রোক মস্তিষ্কের রোগ, আর হার্ট অ্যাটাক হয় হৃৎপিণ্ডে। মস্তিষ্কের কোনো অংশে রক্ত সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে অথবা রক্তনালি ফেটে রক্তক্ষরণ হলে স্ট্রোক হয়। এটি মূলত দুই ধরনের—ইসকেমিক ও হেমোরেজিক। সাময়িকভাবে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে উপসর্গ দেখা দেওয়াকে ট্রানজিয়েন্ট ইসকেমিক অ্যাটাক বলা হয়, যা ভবিষ্যতে বড় ধরনের স্ট্রোকের পূর্বাভাস হতে পারে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইন্টারভেনশনাল নিউরোলজির অধ্যাপক মো. খাইরুল কবির বলেন, ‘ঢাকা মেডিকেলে ইন্টারভেনশনাল নিউরোলজির অধ্যাপক হিসেবে থাকলেও আমার কোনো ক্যাপচার নেই, কোনো স্ট্রোক সেন্টার নেই। হাত–পা বেঁধে একটি পদে বসিয়ে দিলে আমি কী করব?’ তিনি সরকারি হাসপাতালে থ্রম্বোলাইসিসের প্রয়োজনীয় ওষুধ ও সুবিধা বিনা মূল্যে বা স্বল্প মূল্যে দেওয়ার দাবি জানান।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান মো. বাহাদুর আলী মিয়া বলেন, হঠাৎ তীব্র মাথাব্যথা, শরীর দুর্বল বা অবশ হয়ে যাওয়া, মুখ বাঁকা হওয়া এবং কথা জড়িয়ে যাওয়া স্ট্রোকের অন্যতম লক্ষণ। এসব দেখা দিলে সময় নষ্ট না করে দ্রুত মস্তিষ্কের বিশেষায়িত হাসপাতালে নিতে হবে।

ইউনিকো হাসপাতালের জ্যেষ্ঠ কনসালট্যান্ট ইশতিয়াক আহমাদও রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া এবং পৌঁছানোর পরপরই চিকিৎসা শুরুর ওপর গুরুত্ব দেন। অন্যদিকে, এনআইএনএসের নিউরোলজি বিভাগের অধ্যাপক মাহমুদুল ইসলাম বলেন, জেলা ও প্রান্তিক পর্যায়ে বিশেষায়িত নিউরো চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠান না থাকায় রোগীদের এনআইএনএসের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে প্রতিষ্ঠানটির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।

এতে বিভিন্ন হাসপাতাল ও চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা অংশ নেন।

এমপি/ আরআই

আরও পড়ুন