ঢাকা, বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬

২৮ আশ্বিন ১৪৩৩, ০১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮

সোশ্যাল মিডিয়ার ভুয়া পুষ্টি তথ্য, নতুন স্বাস্থ্যঝুঁকি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ০৪:৫৮, ১৪-০৭-২০২৬

সোশ্যাল মিডিয়ার ভুয়া পুষ্টি তথ্য, নতুন স্বাস্থ্যঝুঁকি

ছবি: মেডিকেল পোস্ট

সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া যাচাইবিহীন পুষ্টি-সংক্রান্ত তথ্য, কার্যকরী খাবারের অতিরঞ্জিত প্রচারণা এবং অবৈজ্ঞানিক খাদ্যাভ্যাসের পরামর্শ জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন হুমকি হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনিরাপদ খাবারের মতোই বিভ্রান্তিকর পুষ্টি তথ্যও মানুষের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে পারে। তাই এই ধরনের তথ্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

ভিয়েতনামের জিয়া দিন্ ভা সা হোই (ফ্যামিলি অ্যান্ড সোসাইটি) পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দেশটির জননিরাপত্তা মন্ত্রণালয়ের অধীন হাসপাতাল ১৯-৮-এর পথ্য ও পুষ্টি বিভাগের প্রধান ড. লে থি হুয়ং জিয়াং বলেন, বর্তমানে খাদ্য নিরাপত্তার পাশাপাশি পুষ্টি-সংক্রান্ত ভুল তথ্যও জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।

তিনি বলেন, বর্তমানে স্মার্টফোনে কয়েকটি ক্লিকেই খাদ্যাভ্যাস, ওজন কমানো ও স্বাস্থ্যবিষয়ক হাজারো পরামর্শ পাওয়া যায়। কিন্তু এসব তথ্যের বড় একটি অংশের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। অনেক ক্ষেত্রে খাদ্য-পরিপূরকের উপকারিতা অতিরঞ্জিত করা হয়, আবার চরম খাদ্যাভ্যাসকে উৎসাহিত করা হয়, যা মানুষকে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে প্ররোচিত করে।

ড. জিয়াং বলেন, দূষিত খাবার যেমন সরাসরি শরীরের ক্ষতি করতে পারে, তেমনি বিভ্রান্তিকর পুষ্টি তথ্য মানুষের চিন্তাভাবনা ও স্বাস্থ্যচর্চার ধরন বদলে দেয়। ফলে মানুষ ভুল খাবার নির্বাচন করে এবং দীর্ঘমেয়াদে নানা অসংক্রামক রোগের ঝুঁকিতে পড়ে।

তার ভাষায়, খাদ্য নিরাপত্তা এবং পুষ্টিগত নিরাপত্তা এক বিষয় নয়। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে কোনো খাবার তাৎক্ষণিক ক্ষতি করবে কি না, আর পুষ্টিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করে একজন মানুষ দীর্ঘমেয়াদে সুষম, নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য পাচ্ছেন কি না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে ইন্টারনেট স্বাস্থ্যবিষয়ক একটি বিশাল তথ্যভাণ্ডারে পরিণত হলেও সেখানে নির্ভরযোগ্য তথ্যের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ যাচাইবিহীন তথ্যও ছড়িয়ে রয়েছে। বিশেষ করে দ্রুত ওজন কমানো, শরীর 'ডিটক্স' করা, অলৌকিকভাবে রোগ সারানোর দাবি কিংবা অযোগ্য ব্যক্তিদের পুষ্টি পরামর্শ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে।

ড. জিয়াং উদাহরণ দিয়ে বলেন, ওজন কমানোর ক্ষেত্রে অনেকেই শুধুমাত্র চিকেন ব্রেস্ট খাওয়া, কার্বোহাইড্রেট পুরোপুরি বাদ দেওয়া বা একাধিক খাদ্যগোষ্ঠী এড়িয়ে চলার মতো ডায়েট অনুসরণ করেন। অথচ এতে শক্তি, ভিটামিন ও খনিজের ঘাটতি তৈরি হতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে এমন খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখাও কঠিন।

তার মতে, বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক খাদ্যতালিকায় মাছ, ডিম, চর্বিহীন মাংস, চিংড়ি, টোফুসহ বিভিন্ন উৎস থেকে প্রোটিন, পরিমিত শর্করা, গোটা শস্য, মিষ্টি আলু, পর্যাপ্ত সবুজ শাকসবজি ও ফলমূল থাকতে হবে। কার্যকরভাবে ওজন কমানোর অর্থ কম খাওয়া নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদে অনুসরণ করা যায় এমন সুষম খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা।

তিনি আরও বলেন, পুষ্টির ক্ষেত্রে কোনো সর্বজনীন সূত্র নেই। প্রত্যেক মানুষের বয়স, শারীরিক অবস্থা, পুষ্টির চাহিদা ও রোগভেদে খাদ্য পরিকল্পনা ভিন্ন হতে পারে। তাই খুব দ্রুত ফল পাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া যে কোনো পরামর্শ সতর্কতার সঙ্গে গ্রহণ করা উচিত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো একটি খাবার, পানীয় বা ডায়েটারি সাপ্লিমেন্ট কখনোই সুষম খাদ্যাভ্যাসের বিকল্প হতে পারে না। স্বাস্থ্য নির্ভর করে সামগ্রিক জীবনযাত্রার ওপর, যার মধ্যে রয়েছে সুষম খাদ্য, নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যকর অভ্যাস বজায় রাখা।

ড. জিয়াং বলেন, রোগ হওয়ার পর চিকিৎসার চেয়ে দৈনন্দিন জীবনযাপনের মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই নিরাপদ খাদ্যের পাশাপাশি বৈজ্ঞানিক ও নির্ভরযোগ্য পুষ্টি তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য নিয়ন্ত্রণ করাও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

তার ভাষায়, আজ খাদ্য নিরাপত্তা যেমন খাদ্যে বিষক্রিয়া প্রতিরোধে সহায়তা করছে, তেমনি পুষ্টিগত নিরাপত্তা ভবিষ্যতে দীর্ঘস্থায়ী রোগ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ডিজিটাল যুগে জনস্বাস্থ্য রক্ষা করতে হলে শুধু আমরা কী খাচ্ছি তা নয়, আমরা কী তথ্য বিশ্বাস করছি—সেটিও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

এমপি/ আরআই

আরও পড়ুন