ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬

২৭ আশ্বিন ১৪৩৩, ০১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮

ঢামেকে দালালের ফাঁদে হাজারো রোগী

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০২:১৫, ২১-০৯-২০২৬

ঢামেকে দালালের ফাঁদে হাজারো রোগী

ছবি: মেডিকেল পোস্ট

সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা মানুষের সরলতাকে সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করছে দালাল চক্র। সহায়তাকারী সেজে রোগীদের বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য পাঠানো হচ্ছে হাসপাতালের আশপাশের বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। এতে কয়েক গুণ বেশি টাকা গুনতে হচ্ছে রোগীদের। অনেকেই আবার এটিকে হাসপাতালের স্বাভাবিক চিকিৎসাপ্রক্রিয়া মনে করে দালালদের কথায় বিশ্বাস করছেন।

গোপালগঞ্জ থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা বাবু মিয়াও জানতেন না, তিনি দালালের খপ্পরে পড়েছেন। সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক যে পরীক্ষার কথা বলেছেন, তা করাতে সড়কের উল্টো পাশের একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যান তিনি। দেশের সবচেয়ে বড় হাসপাতালের চিকিৎসাপ্রক্রিয়াই বুঝি এমন—এমন ধারণা থেকেই দালালদের সহজেই বিশ্বাস করেন তিনি। পরে কয়েক গুণ বেশি অর্থ খরচ করে প্রায় শূন্য হাতে ফিরতে হয়েছে তার পরিবারকে।

এক ভুক্তভোগী বলেন, “এখন আমরা কি জানি নাকি যে, কোথায় পরীক্ষা করালে কম খরচে হবে, কোথায় বেশি খরচ হবে। আমাদেরকে বাইরে থেকে দেখিয়ে দিয়েছে যে, এই জায়গায় যাও। আমরা সেই জায়গায় গিয়েছি, আমাদের ২৯শ টাকা বিল করেছে।”

আরেক ভুক্তভোগী বলেন, “আমরা কি বুঝি! হুজুরে বলেছে যে, ঐ জায়গা থেকে (পরীক্ষা) করে নিয়ে আস। আমাদেরকে নিয়ে গেছে সাথে করে, আমরা করে এনেছি।”

দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রাজধানীতে চিকিৎসা নিতে আসা প্রান্তিক মানুষের অসহায়ত্বকে কাজে লাগিয়ে এমন ঘটনা অহরহ ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে। দালালরা সহায়তার কথা বলে রোগীদের পছন্দের বা নির্দিষ্ট বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়ে যাচ্ছেন।

এক ভুক্তভোগী বলেন, “আমরাতো বুঝি না। আমরা এসেছি নতুন এখানে। ওরা নিয়ে আসছে, ওরা ভালো জায়গায় নিয়ে রক্ত পরীক্ষা করিয়েছে। টাকা নিয়েছে ১৬শ।”

আরেকজন বলেন, “এক সার্জারি ডাক্তারের কাছে পাঠিয়েছে। আমার হাত থেকে রক্ত নিতে গিয়ে উনি আমাকে বলেছে যে, এক লাখ টাকা লাগবে।”

সরকারি হাসপাতালে টিকিট কাটা, চিকিৎসক দেখানো এবং পরীক্ষা করাতে দীর্ঘ সময় লাগে। কখনো কখনো চিকিৎসা শুরু করতেই মাস পেরিয়ে যায়। রোগীদের এই ভোগান্তি ও দীর্ঘসূত্রতার সুযোগ নেয় দালালরা।

এক রোগী বলেন, “ডাক্তাররা বলেন, তাড়াতাড়ি করে নিয়ে আস। এভাবে আমাদেরকে দালালের মাধ্যমে চলে যেতে হয়।”

আরেক নারী রোগী বলেন, “আমার কোন রোগ হয়েছে সেটা এখনও জানায়নি। শুধু টেস্টই দিয়ে যাচ্ছে। তো আমরা আর কত টেস্ট করব?”

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সক্ষমতার তুলনায় কয়েক গুণ বেশি রোগীর চাপ থাকায় সরকারি হাসপাতালে কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। উপজেলা পর্যায়ে মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা না গেলে রাজধানীমুখী রোগীর চাপ কমানো সম্ভব হবে না। ফলে দালাল চক্রের দৌরাত্ম্যও পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন হবে।

শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা: মির্জা জিয়াউল ইসলাম বলেন, “দালাল রোগী ভাগিয়ে নেওয়ার চরম শাস্তি হওয়া উচিৎ। পৃথিবীতে যত ধরণের আইন তার সবই আছে বাংলাদেশে। আইনের প্রয়োগ করার জন্য যাদেরকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তারা যদি দায়িত্ব (পালন) না করে, তো আপনি কি করবেন।”

চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ডা: লিয়াকত আলী বলেন, “জনগণকে যদি বিকল্প ব্যবস্থা আপনি না দেন, মানসম্পন্ন পাবলিক সেক্টর যদি না থাকে, তাহলে আপনি যতই চেষ্টা করুন না কেন, এভাবেই হতে থাকবে। কারণ তাকে বিভ্রান্ত করবে দালালরা। আপনি যতই চেষ্টা করবেন, আবার ফিরে ফিরে হবে, একেবারে বন্ধ হবে না।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু দালালদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেই এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। সরকারি হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানো, চিকিৎসাসেবার কাঠামোগত উন্নয়ন এবং উপজেলা পর্যায়ে মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করার মাধ্যমে রাজধানীমুখী রোগীর চাপ কমাতে হবে।

এদিকে, দেশের সবচেয়ে বড় সরকারি হাসপাতাল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। হাসপাতালের গেট পেরোলেই আশপাশে রয়েছে একের পর এক বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের একটি অংশ দালালের খপ্পরে পড়ে হয়রানির শিকার হচ্ছেন এবং গুনছেন বাড়তি টাকা। দালাল চক্রের এই দৌরাত্ম্য ঠেকাতে কার্যকর নজরদারি ও ব্যবস্থা কতটা রয়েছে, সে প্রশ্নও রয়ে গেছে।

এমপি/ আরআই

সম্পর্কিত বিষয়:

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন