ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬

২৭ আশ্বিন ১৪৩৩, ২৯ রবিউস সানি ১৪৪৮

দেশের ৮৫ শতাংশ বাসার পানিতে মলের জীবাণু

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১১:৩৭, ১২-১০-২০২৬

দেশের ৮৫ শতাংশ বাসার পানিতে মলের জীবাণু

ছবি: মেডিকেল পোস্ট

দেশের প্রায় ৮৫ শতাংশ পরিবারের ব্যবহারযোগ্য পানিতে মলের জীবাণু ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা ও চট্টগ্রামের পটিয়ায় ভূগর্ভস্থ পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে, দীর্ঘদিনের দূষণে রাজধানীর চারপাশের নদীগুলোর পানির মানও উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে।

সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও জাতিসংঘের শিশু তহবিল (ইউনিসেফ)-এর ‘মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (মিকস) ২০২৫’-এর প্রাথমিক ফলাফল এবং পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থার (ওয়ারপো) মূল্যায়নে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

ইউনিসেফের সার্ভে অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৯৮ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ অন্তত মৌলিক পানির সুবিধা পেলেও নিরাপদভাবে ব্যবস্থাপিত পানির সুবিধা পান মাত্র ৪২ দশমিক ৬ শতাংশ। পানির উৎসের নমুনায় ৪৭ শতাংশ ক্ষেত্রে ই. কোলাই পাওয়া গেছে। তবে উৎস থেকে পানি সংগ্রহ, পরিবহণ ও সংরক্ষণের ত্রুটির কারণে বাসাবাড়িতে ব্যবহারের সময় দূষণের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৪ দশমিক ৯ শতাংশে। দরিদ্র পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে এ হার আরও বেশি, প্রায় ৯০ দশমিক ৪ শতাংশ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে ডায়রিয়া, জ্বর, রক্তশূন্যতা ও বমির মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে কিডনি বিকল হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। শিশু ও বয়স্করা এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত এ সমস্যার সমাধান করা না গেলে শিশুদের সুস্থভাবে বেড়ে ওঠা ব্যাহত হতে পারে।

এদিকে, ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত উত্তোলনের কারণে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় তীব্র পানিসংকট দেখা দিয়েছে। ওয়ারপোর পর্যালোচনা অনুযায়ী, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁর ২৫টি উপজেলার ২১৫টি ইউনিয়ন এবং ৪ হাজার ৯১১টি মৌজার মধ্যে ৪৭টি ইউনিয়ন অতি উচ্চ, ৪০টি উচ্চ এবং ৬৬টি মধ্যম মাত্রার পানিসংকটাপন্ন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। সব মিলিয়ে তিন জেলার ১৫৩টি ইউনিয়নে তীব্র পানিসংকটের চিত্র উঠে এসেছে।

সেচকাজে ব্যাপকভাবে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন, পানির পুনর্ভরণ কমে যাওয়া এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে এ সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

একইভাবে, চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার তিনটি ইউনিয়ন অতি উচ্চ, চারটি উচ্চ এবং পাঁচটি মধ্যম মাত্রার পানিসংকটাপন্ন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। শিল্পকারখানায় গভীর নলকূপের মাধ্যমে অতিরিক্ত পানি উত্তোলন এ সংকটের অন্যতম কারণ।

অন্যদিকে, রাজধানীর চারপাশের বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীর পানির মান পরীক্ষায় দূষণের উদ্বেগজনক চিত্র পেয়েছে ওয়ারপো। চার নদীর ৩৬টি স্থান থেকে চার মৌসুমে নমুনা সংগ্রহ করে ১৬টি প্যারামিটারে পানির মান পরীক্ষা করা হয়।

ওয়ারপোর সমন্বিত পানির গুণগত মান সূচক (ডব্লিউকিউআই) অনুযায়ী, শুষ্ক মৌসুমে অধিকাংশ স্থানে নদীর পানির মান ‘খারাপ’ পর্যায়ে থাকে। বর্ষায় কিছুটা উন্নতি হলেও কোনো স্থানের পানির মান ‘চমৎকার’ পর্যায়ে পৌঁছায়নি।

গবেষণায় বুড়িগঙ্গার পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের (ডিও) মাত্রা মারাত্মকভাবে কম এবং জৈব রাসায়নিক অক্সিজেন চাহিদা (বিওডি) অনেক বেশি পাওয়া গেছে। এতে নদীতে উচ্চমাত্রার জৈব দূষণ এবং জলজ প্রাণীর বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেনের তীব্র ঘাটতির চিত্র উঠে এসেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিল্পকারখানা, বিভিন্ন সংস্থা, সাধারণ মানুষ ও হাটবাজার থেকে ফেলা বর্জ্য নদীদূষণের অন্যতম উৎস। এসব উৎস থেকে বর্জ্য ফেলা বন্ধ করা না গেলে নদীর পানির মান কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে।

বিশেষজ্ঞরা ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে সংকটপূর্ণ এলাকায় গভীর নলকূপ স্থাপন সীমিত করা, ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়ানো, ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমানো এবং পানি পুনর্ব্যবহারের নীতি অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছেন।

এমপি/আরআই

আরও পড়ুন