ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬

২৭ আশ্বিন ১৪৩৩, ০১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮

স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী

কমিউনিটিভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৩:৫৭, ১১-১০-২০২৬

কমিউনিটিভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার

ছবি: মেডিকেল পোস্ট

মানসিক স্বাস্থ্য কর্মসূচির অন্যতম অগ্রাধিকার হবে কমিউনিটিভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবা। এ জন্য চলতি অর্থবছরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জন্য দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দের আওতায় সুনির্দিষ্ট কিছু কর্মসূচি প্রণয়ন করা হয়েছে। এসব কর্মসূচির বাস্তবায়ন এ বছরই শুরু হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা: এম এ মুহিত।

রোববার (১১ অক্টোবর) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস’ উপলক্ষ্যে বাংলাদেশ ক্লিনিক্যাল সমাজকর্মী সমিতি আয়োজিত জাতীয় সেমিনারে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। সেমিনারের প্রতিপাদ্য ছিল ‘বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে অর্থবহ পরিবর্তন : মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় ক্লিনিক্যাল সমাজকর্মের চর্চার প্রসার’।

মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা সম্পর্কে প্রচলিত ধারণার সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, সাধারণ মানুষের মধ্যে এমন ধারণা রয়েছে যে মানসিক অসুস্থতা বলতে গুরুতর অবস্থা বোঝায়, যখন কোনো ব্যক্তি চিৎকার করেন বা সিজোফ্রেনিয়ার মতো রোগে আক্রান্ত হন। এসব সমস্যা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার পরিসর আরও বিস্তৃত। আপাতদৃষ্টিতে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করা অনেক মানুষও বিষণ্ণতায় ভুগছেন। বিষণ্ণতার বিভিন্ন মাত্রা রয়েছে। মৃদু বিষণ্ণতাও দীর্ঘদিন স্থায়ী হয়ে দীর্ঘস্থায়ী বিষণ্ণতায় রূপ নিতে পারে।

তিনি বলেন, দেশে তৃতীয় পর্যায়ের বিশেষায়িত চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠান থাকলেও সেখানে সাধারণত গুরুতর সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিরাই সেবা নিতে যান। কিন্তু উদ্বেগ, বিষণ্ণতা ও মানসিক চাপে দীর্ঘদিন ধরে ভুগতে থাকা মানুষের সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি। এ ধরনের মানুষের জন্যও কার্যকর সেবা ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।

স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের পথে বড় বাধা হলো প্রশিক্ষিত জনবলের অভাব। আবার যেসব ক্ষেত্রে প্রশিক্ষিত জনবল রয়েছে, সেখানেও তাদের দক্ষতা কাজে লাগানোর উপযুক্ত ক্ষেত্র তৈরি করা যাচ্ছে না। এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে হবে।

দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত মানসিক স্বাস্থ্য খাতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, এ জন্য সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের কাজের সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় নীতিগত পরিবেশ তৈরি করতে সরকার নিজ নিজ অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখবে।

তিনি বলেন, এ বছর বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দেওয়া দীর্ঘ বার্তাতেও মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। শুধু শারীরিক সুস্থতার দিকে নজর দিলেই চলবে না। বাইরে থেকে সুস্থ ও স্বাভাবিক মনে হওয়া অনেক মানুষও বর্তমান জীবনযাপন, কর্মক্ষেত্রের চাপ ও অর্থনৈতিক সংকটের কারণে মানসিক সমস্যায় ভুগছেন।

শিক্ষার্থী ও নতুন কর্মজীবীদের মধ্যে উদ্বেগ ও মানসিক চাপের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, অর্থনৈতিক সংকট এবং দীর্ঘমেয়াদি উদ্বেগ মানুষের কাজের দক্ষতা ও কর্মসম্পাদনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। একই সঙ্গে পরিবার ও সমাজের প্রতি দায়িত্ব পালনেও বাধা সৃষ্টি করে। তাই মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার বিভিন্ন ধরন সম্পর্কে জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ক্লিনিক্যাল সমাজকর্মী সমিতির মতো পেশাজীবী সংগঠনগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী জানান, সরকার এ বছর একটি পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছে। ক্লিনিক্যাল সমাজকর্মীদের পেশাগত দক্ষতা এ প্রকল্পে কাজে লাগানো হবে। প্রকল্প থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা ও শিক্ষার ভিত্তিতে সরকারের আগামী চার বছরের মেয়াদে আরও বড় পরিসরে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পেশার সঙ্গে যুক্ত সবাইকে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে।

প্রস্তাবিত কর্মসূচিতে উদ্বেগ, মানসিক চাপ ও বিষণ্ণতা, কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্য, ডিজিটাল আসক্তি, পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা, ঘনিষ্ঠ সঙ্গীর সহিংসতা ও পারিবারিক মানসিক আঘাত এবং সন্তান জন্মের আগে ও পরে মায়েদের বিষণ্ণতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্য ও ডিজিটাল আসক্তি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ডিজিটাল আসক্তি এখন শুধু কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। অনেক প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের পক্ষেও ফোন ছাড়া অল্প সময় থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দীর্ঘমেয়াদি ডিজিটাল আসক্তির কারণে কিশোর-কিশোরীদের মস্তিষ্কের বিকাশে স্থায়ী ক্ষতির আশঙ্কার বিষয়টিও উঠে এসেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

পারিবারিক বিচ্ছিন্নতার প্রভাব সম্পর্কে প্রতিমন্ত্রী বলেন, আগের তুলনায় পরিবারে বিচ্ছিন্নতার ঘটনা বেড়েছে বলে ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণে মনে হয়। এর নেতিবাচক প্রভাব শিশুদের ওপর পড়ে। কিন্তু এসব পরিস্থিতিতে শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় কাউন্সেলিং বা মানসিক সহায়তার ব্যবস্থা এখনো যথেষ্ট নয়। সরকার ধীরে ধীরে এ ধরনের সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়।

সন্তান জন্মের আগে ও পরে মায়েদের বিষণ্ণতার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ ধরনের বিষণ্ণতা বাংলাদেশে বেশ প্রচলিত হলেও অনেক সময় তা শনাক্ত করা হয় না। সন্তান জন্মের আগে ও পরে মায়েদের ওপর যে মানসিক চাপ তৈরি হয়, তার সঙ্গে সামাজিক ও পারিবারিক আচরণেরও সম্পর্ক রয়েছে। অনেক নতুন মা পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকেই নেতিবাচক মন্তব্য ও বুলিংয়ের শিকার হন। ফলে তাদের মানসিক সংকট আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে কার্যকর করতে এসব সমস্যাকে বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে সামগ্রিকভাবে বিবেচনার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। প্রশিক্ষিত জনবল, পেশাজীবীদের দক্ষতার ব্যবহার, জনসচেতনতা এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সামাজিক সংগঠনগুলোর সমন্বয়ের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের অবহেলিত এই খাতে টেকসই পরিবর্তন আনা সম্ভব বলেও জানান তিনি।

বাংলাদেশ ক্লিনিক্যাল সমাজকর্মী সমিতির সভাপতি অধ্যাপক তাহমিনা আখতারের সভাপতিত্বে সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী ও সংসদ সদস্য অধ্যাপক ডা: এ জেড এম জাহিদ হোসেন। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানী এবং জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. সাইফুন নাহার।

এমপি/ আরআই

আরও পড়ুন