ঢাকা, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬

৫ কার্তিক ১৪৩৩, ০৮ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮

বাড়িতে প্রসব করাতে গিয়ে নবজাতকের মৃত্যু, হাসপাতালে মা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১১:৩৬, ২০-১০-২০২৬

বাড়িতে প্রসব করাতে গিয়ে নবজাতকের মৃত্যু, হাসপাতালে মা

ছবি: মেডিকেল পোস্ট

রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে গ্রাম্য ধাত্রী, ‘পশু চিকিৎসক’ ও এক স্বাস্থ্য সহকারীকে দিয়ে বাড়িতে প্রসব করানোর পর নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে। গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন ১৮ বছর বয়সী প্রসূতি চাঁদনী আক্তার। পরে তাকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করেছে উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ।

গতকাল (১৯ অক্টোবর) উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, অভিযোগ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে, উপজেলার দৌলতদিয়া ইউনিয়নের ফেরিঘাটসংলগ্ন শাহাদাত মেম্বার পাড়ায় এ ঘটনা ঘটে। চাঁদনী দরিদ্র রিকশাচালক চানমিয়া শেখ ও চায়না আক্তার দম্পতির মেয়ে। তার স্বামী মুন্নাফ শেখ গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার বাসিন্দা। বিয়ের চার বছর পর এটিই ছিল চাঁদনীর প্রথম সন্তান।

অভিযুক্তরা হলেন স্থানীয় ধাত্রী রোকেয়া বেগম রুকি, ‘পশু চিকিৎসক’ হিসেবে পরিচিত আসলাম আলী সরদার ও স্বাস্থ্য সহকারী লাভলী আক্তার রথী। আসলামের ভেটেরিনারি সনদ আছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তিনি এলএমএএফ বা পল্লী চিকিৎসক কোর্স করার দাবি করেছেন। অন্যদিকে, লাভলী আক্তার রথী ডিএমএফ সম্পন্ন করার পাশাপাশি স্বাভাবিক প্রসবের প্রশিক্ষণ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। তবে তাদের পেশাগত পরিচয় ও এ ধরনের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার বৈধতা নিশ্চিত হতে পারেনি উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ।

পরিবারের সদস্যরা জানান, গত ৮ অক্টোবর রাত ২টার দিকে চাঁদনীর প্রসবব্যথা শুরু হয়। ভোর ৪টার দিকে স্থানীয় ধাত্রী রোকেয়া বেগম রুকিকে ডেকে আনা হয়। দীর্ঘ সময় চেষ্টা করেও প্রসব করাতে না পারায় সকাল ৭টার দিকে আসলাম আলী সরদারকে খবর দেওয়া হয়। পরিবারের অভিযোগ, তিনি চাঁদনীকে প্রথমে স্যালাইন দেন এবং পরে প্রসবব্যথা বাড়ানোর জন্য ইনজেকশন দেন। এর প্রায় দুই ঘণ্টা পর শিশুটির মাথা বের হলেও প্রসব সম্পন্ন হচ্ছিল না। পরে আসলামের ডাকে ঘটনাস্থলে যান স্বাস্থ্য সহকারী লাভলী আক্তার রথী। পরিবারের অভিযোগ, তিনি প্রসবপথের পাশে কেটে শিশুটিকে বের করেন। তবে শিশুটি মৃত অবস্থায় জন্ম নেয়।

এরপর চাঁদনীর অতিরিক্ত রক্তপাত শুরু হলে ক্ষতস্থানে গজ দিয়ে সেলাই করা হয় এবং ওষুধ দেওয়া হয়। এ কাজের জন্য ৪ হাজার টাকা চাওয়া হলেও তার বাবা ৩ হাজার ৬০০ টাকা দেন বলে পরিবারের সদস্যরা জানান। পরে সেলাইয়ের স্থানে সংক্রমণ দেখা দিলে চাঁদনীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। গত শনিবার (১৭ অক্টোবর) তাকে গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। বর্তমানে তার অবস্থা জটিল বলে জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা।

চাঁদনীর বাবা-মা বলেন, ‘আমরা আমাদের নাতিকে হারিয়েছি। এখন চাই, আমাদের মেয়েটা অন্তত সঠিক চিকিৎসা পেয়ে বেঁচে থাকুক। মেয়ের এই পরিণতির জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ন্যায়বিচার চাই।’

অভিযোগের বিষয়ে স্বাস্থ্য সহকারী লাভলী আক্তার রথী জানান, তিনি চার বছর মেয়াদি ডিএমএফ কোর্স সম্পন্ন করেছেন এবং স্বাভাবিক প্রসব করানোর প্রশিক্ষণ রয়েছে তার। ঘটনাস্থলে গিয়ে শিশুটিকে প্রসবপথে আটকে থাকতে দেখে পরিস্থিতি বিবেচনায় বের করেন বলে দাবি করেন তিনি। তার ভাষ্য, দীর্ঘ সময় বাড়িতে প্রসবের চেষ্টা করায় মা ও শিশুর অবস্থা আগেই খারাপ হয়ে গিয়েছিল।

অন্যদিকে, আসলাম আলী সরদার দাবি করেন, তিনি ২২ থেকে ২৩ বছর ধরে পশু চিকিৎসার পাশাপাশি মানুষের চিকিৎসাও দিয়ে আসছেন। তার এলএমএএফ বা পল্লী চিকিৎসকের কোর্স করা আছে বলেও জানান তিনি। তার দাবি, গ্রামের বহু নারীর সন্তান তার চিকিৎসায় নিরাপদে জন্ম নিয়েছে।

এদিকে, সোমবার দুপুরে চাঁদনীর বাবার বাড়িতে গিয়ে খোঁজ নেন গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা: মারুফ হাসান। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, যথাযথ প্রশিক্ষণ ছাড়া প্রসব করানোর মতো চিকিৎসাসেবা দেওয়া উচিত নয়। আসলাম ও রথীর এ ধরনের সেবা দেওয়ার এখতিয়ার আছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হবে।

তিনি আরও জানান, এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। সিভিল সার্জন ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা হয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করা না হলেও তদন্তের ভিত্তিতে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এমপি/ আরআই

আরও পড়ুন