শিরোনাম
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০৫:০৭, ২১-১০-২০২৬
ছবি: মেডিকেল পোস্ট
সম্প্রতি চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী দ্য ল্যানসেট ডিজিটাল হেলথ-এ গবেষণাটি প্রকাশিত হয়।
গবেষণার অন্যতম লেখক ও ম্যাস জেনারেল ব্রিঘাম ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের রেডিয়েশন ক্যানসার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রেমন্ড ম্যাক বলেন, শুধু মুখের একটি ছবি থেকে মৃত্যুঝুঁকির লক্ষণ শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে—বিষয়টি তাকে বিস্মিত করেছে।
গবেষকেরা ৪ কোটির বেশি মুখের ছবি ব্যবহার করে এআই মডেলটি প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। বিভিন্ন বয়স ও জাতিগত পটভূমির মানুষের ছবি দিয়ে তৈরি মডেলটি মুখের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে জৈবিক বয়স অনুমান করতে পারে। প্রকৃত বয়স হলো জন্মের পর থেকে কেটে যাওয়া বছর। অন্যদিকে, জৈবিক বয়স শরীরের কোষ ও শারীরিক অবস্থার ভিত্তিতে শরীরের বার্ধক্য সম্পর্কে ধারণা দেয়।
রেমন্ড ম্যাকের তথ্যমতে, জৈবিক বয়স নির্ণয়ে এআই কপালের ওপরের অংশ, চোখের ওপরের এলাকা, কানের সামনের দিকের কপাল এবং নাকের দুই পাশ থেকে ঠোঁটের কোণ পর্যন্ত বিস্তৃত রেখা বিশ্লেষণ করে। আর মৃত্যুঝুঁকি নির্ণয়ের ক্ষেত্রে নাকের ওপরের সেতুর মতো অংশ ও চোখের নিচের এলাকা বিশ্লেষণ করা হয়।
প্রায় ২ হাজার ৪০০ বছর আগে গ্রিক চিকিৎসক ও দার্শনিক হিপোক্রেটিসও গুরুতর অসুস্থ মানুষের মুখে মৃত্যুঝুঁকির কিছু লক্ষণের কথা উল্লেখ করেছিলেন। খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় ৪০০ সালে লেখা তার বুক অব প্রগনস্টিকস গ্রন্থে নাক ধারালো হয়ে যাওয়া, চোখ বসে যাওয়া ও কপালের দুই পাশ দেবে যাওয়ার মতো পরিবর্তনের বর্ণনা রয়েছে।
ম্যাক বলেন, এআই মডেলে শনাক্ত হওয়া কিছু লক্ষণের সঙ্গে হিপোক্রেটিসের বর্ণনার সাদৃশ্য রয়েছে। তবে প্রাচীন গ্রন্থের তথ্য দিয়ে মডেলটি প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি। মুখের ছবি, মানুষের বয়স ও মৃত্যুর তথ্য ব্যবহার করেই এটি তৈরি করা হয়েছে।
গবেষকেরা ‘ফাউন্ডেশন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ফর হেলথ রিকগনিশন-ফেস’ বা এফএএইচআর-ফেস নামে একটি মূল এআই মডেল তৈরি করেন। পরে সেটিকে উন্নত করে দুটি পৃথক মডেল বানানো হয়। একটি মুখের ছবি থেকে জৈবিক বয়স অনুমান করে, অন্যটি মুখের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে চিকিৎসাসংক্রান্ত অন্যান্য তথ্য মিলিয়ে ক্যানসার রোগীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা নির্ণয়ের চেষ্টা করে।
মৃত্যুঝুঁকি নির্ণয়কারী মডেলের মূল্যায়নে ১২২ জন ক্যানসার রোগীকে উচ্চ ঝুঁকির দলে রাখা হয়। তাদের মধ্যে ৫২ দশমিক ৫ শতাংশ পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে মারা যান। অন্যদিকে, সবচেয়ে কম ঝুঁকির দলে থাকা ৯৭৫ জন রোগীর মধ্যে একই সময়ে মারা যান প্রায় ২ শতাংশ।
জৈবিক বয়স নির্ণয়কারী মডেলেও উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা গেছে। যেসব ১ হাজার ৬০ জন রোগীর অনুমান করা জৈবিক বয়স প্রকৃত বয়সের চেয়ে ২০ বছরের বেশি ছিল, তাদের ২১ শতাংশ ৯০ দিনের মধ্যে মারা যান। বিপরীতে, জৈবিক বয়স প্রকৃত বয়সের চেয়ে অন্তত ১০ বছর কম ছিল এমন ৪ হাজার ১৯৫ জন রোগীর মধ্যে একই সময়ে মৃত্যুর হার ছিল প্রায় ৬ শতাংশ।
গবেষকেরা আরও জানান, অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে মুখের পরিবর্তন, বোটক্সের মতো ইনজেকশন কিংবা প্রসাধনী ব্যবহারের কারণে মডেল দুটির কার্যকারিতায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যায়নি।
গবেষকেরা জানিয়েছেন, এআই মডেলটি চিকিৎসকদের বিকল্প হিসেবে তৈরি করা হয়নি। প্রচলিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও রোগীর শারীরিক অবস্থা মূল্যায়নের পাশাপাশি এটি অতিরিক্ত একটি উপায় হিসেবে কাজে লাগতে পারে।
ম্যাকের মতে, দ্রুত বার্ধক্যের লক্ষণ বা মৃত্যুর উচ্চ ঝুঁকি আগেভাগে শনাক্ত করা গেলে কিছু রোগীকে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য বেছে নেওয়া সম্ভব হতে পারে।
তবে গবেষণাটি শুধু ক্যানসার রোগীদের মধ্যে পরিচালিত হয়েছে। সুস্থ মানুষের আয়ু বা দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সম্পর্কে এই প্রযুক্তি কতটা নির্ভরযোগ্য পূর্বাভাস দিতে পারবে, তা জানতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
যুক্তরাষ্ট্রের এমরি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও গবেষক উইলবার ল্যাম গবেষণাটিকে আকর্ষণীয় বলে উল্লেখ করেছেন। তবে চিকিৎসাক্ষেত্রে প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে আরও পরীক্ষা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে মডেলটি সমানভাবে নির্ভুল কি না, তা-ও যাচাই করতে হবে। মুখের গড়ন, গায়ের রং ও বয়সের মতো বৈশিষ্ট্য ফলাফলে কতটা প্রভাব ফেলে, সেটিও গবেষণার বিষয়।
যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব সারির অধ্যাপক মিরোস্লাভ বোবারের মতে, ক্যানসার রোগীদের মুখের বৈশিষ্ট্য ও বেঁচে থাকার সম্ভাবনার মধ্যে পরিসংখ্যানগত সম্পর্কের পক্ষে গবেষণাটি উল্লেখযোগ্য প্রমাণ দিয়েছে। তবে কোনো ঘটনার পূর্বাভাস দেওয়া আর তার কারণ ব্যাখ্যা করা এক বিষয় নয়। এআই মুখের চেহারা দেখে বয়স অনুমান করছে, শরীরের ভেতরে বার্ধক্যের প্রক্রিয়া সরাসরি পরিমাপ করছে না।
তাই গবেষণাটি আশাব্যঞ্জক হলেও, শুধু মুখের ছবি দেখে কোনো ক্যানসার রোগীর আয়ু বা চিকিৎসার ফলাফল নিশ্চিতভাবে বলে দেওয়া সম্ভব নয়। প্রযুক্তিটির নির্ভরযোগ্যতা ও চিকিৎসাক্ষেত্রে কার্যকারিতা প্রতিষ্ঠায় আরও গবেষণা প্রয়োজন।
এমপি/ আরআই