শিরোনাম
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৬:২৪, ১৬-০৯-২০২৬
ছবি: মেডিকেল পোস্ট
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের (চমেক) প্রধান কনফারেন্স হলে ‘মেজার্স আউটব্রেক ২০২৬-ইন সাউদার্ন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণার ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
চট্টগ্রাম অঞ্চলের সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ৩০০ হাম আক্রান্ত শিশুর ওপর এপিডেমিওলজিক্যাল, ক্লিনিক্যাল ও জিনোমিক গবেষণাটি করা হয়। গবেষণাটি করেছে এসপেরিয়া হেলথ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (এআরএফ)।
গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেন প্রধান গবেষক চমেকের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা: কামরুন নাহার ও সহযোগী গবেষক ডা: সেলিনা হক।
গবেষণায় অংশ নেওয়া ৩০০ শিশুর মধ্যে ১১৪ জনের বয়স ছিল ৯ মাসের কম। অর্থাৎ নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে হামের প্রথম টিকা নেওয়ার বয়স হওয়ার আগেই তারা আক্রান্ত হয়েছে। গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত শিশুদের বয়স ছিল ২ মাস থেকে ১১ বছর।
আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে ১৬৭ জন বা ৮৫ দশমিক ২ শতাংশ সম্পূর্ণ টিকাবিহীন। তাদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছিল।
টিকা নেওয়ার উপযুক্ত বয়স হওয়ার পরও যারা টিকা নেয়নি, তাদের ৫২ দশমিক ৬ শতাংশের ক্ষেত্রে সচেতনতার অভাব বা নির্ধারিত তারিখ ভুলে যাওয়ার বিষয়টি কারণ হিসেবে পাওয়া গেছে। ৩০ শতাংশ শিশুর ক্ষেত্রে টিকা দেওয়ার সময় সাময়িক অসুস্থতা, ৮ দশমিক ৯ শতাংশের ক্ষেত্রে মায়ের অসুস্থতা এবং ৪ দশমিক ৬ শতাংশের ক্ষেত্রে ইপিআই কার্ড হারিয়ে যাওয়া বা নষ্ট হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
এদিকে, হাম আক্রান্ত শিশুদের ৩১ দশমিক ৯ শতাংশ তীব্র অ্যাকিউট পুষ্টিহীনতায় ভুগছিল। গবেষণায় গুরুতর জটিলতার সঙ্গে তীব্র অপুষ্টির সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
গত ছয় মাসে সরকারি ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল পেয়েছিল মাত্র ৩২ দশমিক ১ শতাংশ বা ৬৩ জন শিশু। যারা ভিটামিন ‘এ’ পায়নি, তাদের ৫৯ শতাংশের মধ্যে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়াসহ গুরুতর শারীরিক জটিলতা দেখা গেছে।
গবেষণায় অংশ নেওয়া ৩০০ শিশুর মধ্যে মাত্র ৩২ জন বা ১৬ দশমিক ৩ শতাংশের ক্ষেত্রে আগে সরাসরি হাম রোগীর সংস্পর্শে আসার তথ্য নিশ্চিত করা গেছে। বিপরীতে ৫৯ দশমিক ৪ শতাংশ শিশু অন্য রোগের চিকিৎসার জন্য স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, ক্লিনিক বা হাসপাতালে যাওয়ার পর হামে আক্রান্ত হয়েছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
গবেষকেরা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে দ্রুত রোগী শনাক্ত করা, সংক্রমিত রোগীকে আলাদা রাখা এবং পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
অপরদিকে, আক্রান্ত শিশুদের নমুনার হোল জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ে ১০০ শতাংশ ক্ষেত্রে ‘বি-৩’ জিনোটাইপ শনাক্ত হয়েছে। গবেষকদের মতে, এর আগে আইইডিসিআর ও আইসিডিডিআর,বি’র গবেষণাতেও বাংলাদেশে বি-৩ জিনোটাইপের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
গবেষণাকালীন সময়ে বিদেশ থেকে নতুন কোনো হামের স্ট্রেইন দেশে প্রবেশ করেছে—এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলেও জানিয়েছেন গবেষকেরা।
গবেষণায় আগে হামের অন্তত একটি টিকা নেওয়া শিশুদের মধ্যে কোনো মৃত্যু পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে টিকাবিহীন শিশুদের গুরুতর জটিলতায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা টিকা নেওয়া শিশুদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ ছিল।
চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘প্রায় অর্ধেক শিশু টিকার বয়সের আগেই আক্রান্ত হচ্ছে, এটি আমাদের টিকাদান কৌশল পুনর্মূল্যায়নের ইঙ্গিত দেয়। কোনো শিশুর হামে মৃত্যু গ্রহণযোগ্য নয়।’
রুটিন টিকাদানের কভারেজ ৯৫ শতাংশ বা তার ওপরে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, বস্তি, দুর্গম এলাকা ও সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের শিশুদের জন্য প্রয়োজনে বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা হবে।
চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা: মো. তসলিম উদ্দীন বলেন, ‘হাসপাতাল থেকে প্রায় ৬০ শতাংশ শিশু সংক্রমিত হওয়াটা আমাদের সতর্কবার্তা দেয়।’ হাসপাতালগুলোতে র্যাপিড ট্রায়াজ, তাৎক্ষণিক আইসোলেশন ও পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
চমেকের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা: মো. জসিম উদ্দীন বলেন, ‘চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণাকে মাঠপর্যায়ে প্রয়োগ করাই মূল লক্ষ্য।’ গবেষণার উপাত্ত ও সুপারিশ নীতিনির্ধারকদের জন্য দিকনির্দেশনামূলক ভূমিকা রাখবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
এসপেরিয়া হেলথ কেয়ার ও এআরএফের চেয়ারম্যান গোলাম বাকী মাসুদ বলেন, গবেষণার তথ্যকে বাস্তবমুখী জনস্বাস্থ্য পদক্ষেপে রূপান্তর করতে হবে। এআরএফ ভবিষ্যতেও মহামারি প্রতিরোধ ও জনস্বাস্থ্য গবেষণায় প্রমাণভিত্তিক সমাধান তৈরিতে কাজ করবে বলে জানান তিনি।
গবেষকেরা দক্ষিণ বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে টিকাদানের হার ৯৫ শতাংশের ওপরে নিশ্চিত করা, বাদ পড়া শিশুদের খুঁজে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি চালানো এবং বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকা দেওয়ার সুপারিশ করেছেন।
৯ মাস বয়সের আগে আক্রান্ত শিশুদের সংখ্যা বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, আইসোলেশন ও পোস্ট-এক্সপোজার প্রোফাইল্যাক্সিস চালুর পাশাপাশি বিশেষ মহামারি পরিস্থিতিতে ৬ মাস বয়সে প্রথম এমআর টিকা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনার সুপারিশ করা হয়েছে।
এ ছাড়া অপুষ্টি কমাতে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল বিতরণ জোরদার, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, পৃথক আইসোলেশন ইউনিট, পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ ও নজরদারি জোরদারের সুপারিশ করা হয়েছে।
এমপি/ আরআই