ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

১৪ কার্তিক ১৪৩৩, ১৭ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮

গবেষণা

চিকিৎসার খরচে দারিদ্র্যসীমার নিচে ১ কোটি ৮ লাখ মানুষ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৪:২২, ২৯-১০-২০২৬

চিকিৎসার খরচে দারিদ্র্যসীমার নিচে ১ কোটি ৮ লাখ মানুষ

ছবি: মেডিকেল পোস্ট

চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে ২০২২ সালে দেশে ১ কোটি ৮ লাখের বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছেন। ওই বছর দেশের মোট জনসংখ্যার ৬ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ এ পরিস্থিতিতে পড়েন। একই সঙ্গে চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে আর্থিক সংকটে পড়া মানুষের হারও বেড়েছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের (এইচইইউ) নতুন এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও সুইডিশ দূতাবাসের সহায়তায় পরিচালিত ‘বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবায় ব্যক্তিগত ব্যয়ের কারণে সৃষ্ট আর্থিক সংকট ও সরকারি স্বাস্থ্যসেবার সুবিধা বণ্টন’ শীর্ষক গবেষণার ফল সম্প্রতি উপস্থাপন করা হয়।

গবেষণায় দেখা যায়, ২০০৫ সালে চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে ৫৬ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গিয়েছিলেন, যা ছিল ওই সময়ের জনসংখ্যার ৩ দশমিক ৯ শতাংশ। ২০২২ সালে এ হার বেড়ে দাঁড়ায় ৬ দশমিক ৪ শতাংশে। অথচ একই সময়ে দেশে দারিদ্র্যের হার ৪০ শতাংশ থেকে কমে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে আসে।

এদিকে, চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে আর্থিক সংকটে পড়া মানুষের হারও বেড়েছে। ২০০৫ সালে এ হার ছিল ২৮ দশমিক ২ শতাংশ, যা ২০২২ সালে বেড়ে ৪১ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়ায়। বিশ্বব্যাপী এ হার ছিল ২৬ শতাংশ।

এইচইইউর ফোকাল পয়েন্ট সুব্রত পাল বলেন, চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি ভুগেছে দরিদ্র পরিবারগুলো। তিনি বলেন, ‘এতে দেখা যায়, আর্থিক চাপে না পড়ে চিকিৎসার খরচ বহন করার ক্ষেত্রে পরিবারগুলোর সক্ষমতা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমেছে।’

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, চিকিৎসাব্যয়ের কারণে পরিবারের আর্থিক বিপর্যয়ের হার ২০০৫ সালের ১২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২২ সালে ৩২ দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে। মূল্যস্ফীতির প্রভাব সমন্বয় করার পরও পরিবারের চিকিৎসায় নিজস্ব ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ২০০৫ সালে একটি পরিবারের মাসিক গড় চিকিৎসাব্যয় ছিল ১ হাজার ২৪১ টাকা, যা ২০২২ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ২৩৮ টাকায়।

একই সময়ে চিকিৎসায় নিজস্ব ব্যয় হয়েছে—এমন পরিবারের অনুপাত ৫২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯২ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছেছে। চিকিৎসাব্যয়ের বড় অংশ যাচ্ছে ওষুধ, রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষা, হাসপাতালে ভর্তি এবং চিকিৎসকের পরামর্শের ফি বাবদ।

গবেষণায় বলা হয়েছে, বহির্বিভাগের চিকিৎসার জন্য ফার্মেসির ওপর নির্ভরশীলতাও বেড়েছে। ২০১৬ সালে এ ধরনের চিকিৎসাসেবার ৩২ দশমিক ৫ শতাংশ ফার্মেসির মাধ্যমে নেওয়া হতো। ২০২২ সালে এ হার বেড়ে দাঁড়ায় ৫৫ দশমিক ৪ শতাংশে।

আয়ের ভিত্তিতে বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২২ সালে সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ মানুষের মধ্যে ৯০ দশমিক ৮ শতাংশ চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে আর্থিক সংকটে পড়েছেন। সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ মানুষের ক্ষেত্রে এ হার ছিল ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ৪৭ দশমিক ৯ শতাংশ এ সংকটে পড়লেও শহরাঞ্চলে এ হার ছিল ২৮ দশমিক ২ শতাংশ।

বিভাগভিত্তিক হিসাবে, ২০০৫ সালে বরিশালে চিকিৎসাব্যয়ের কারণে আর্থিক সংকটে পড়া মানুষের হার ছিল সবচেয়ে কম, ২২ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০২২ সালে বিভাগটিতেই এ হার বেড়ে সর্বোচ্চ ৫৯ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়ায়।

হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো প্রধান ভরসা হলেও সেখানে চিকিৎসা নেওয়ার হার কমেছে। ২০১৬ সালে হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের ৬১ দশমিক ৩ শতাংশ সরকারি প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা নিতেন, ২০২২ সালে তা কমে ৫৬ শতাংশে দাঁড়ায়। বিপরীতে, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা নেওয়ার হার ৩৬ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে।

গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, দরিদ্র মানুষের স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজন বেশি হলেও সরকারি স্বাস্থ্যব্যয়ের সুবিধা তাদের অনুকূলে যাচ্ছে না। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালের তুলনায় ২০২২ সালে সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেওয়ার ক্ষেত্রে দরিদ্রদের অনুকূলে থাকা সুবিধা বণ্টনের প্রবণতা কমেছে।

চিকিৎসাব্যয়ের কারণে মানুষের আর্থিক সংকট কমাতে সরকারি অর্থায়ন বাড়ানো, ব্যয়ের দক্ষতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করা এবং দরিদ্র মানুষের কাছে সরকারি স্বাস্থ্যসেবার সুবিধা পৌঁছানোর সুপারিশ করেছে গবেষণাটি। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ওষুধ ও রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষা বিনামূল্যে ও নির্ভরযোগ্যভাবে নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগের জন্য নিয়মিত ও সাশ্রয়ী চিকিৎসার ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এমপি/ আরআই

আরও পড়ুন