ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬

২৭ আশ্বিন ১৪৩৩, ২৯ রবিউস সানি ১৪৪৮

গবেষণা

সাধারণ চুলা, দূষিত পানি-শৌচাগারে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৬:১৩, ২৮-০৮-২০২৬

সাধারণ চুলা, দূষিত পানি-শৌচাগারে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

ছবি: মেডিকেল পোস্ট

দূষিত পানি, অস্বাস্থ্যকর শৌচাগার ও সাধারণ চুলার ব্যবহারসহ জীবনযাপনের নানা কারণে দেশের অনেক পরিবার দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে। এসব পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ডায়রিয়া, শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ, জ্বর, সর্দি-কাশিসহ বিভিন্ন অসুস্থতার প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে।

সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, পরিবারের সুস্বাস্থ্য শিক্ষা, অর্থনৈতিক অবস্থা, নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার ও রান্নার পরিবেশের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের পরিচালিত গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।

গবেষকেরা প্রায় ২৪ হাজার পরিবারের তথ্য বিশ্লেষণ করে ‘ফ্যামিলি হেলথ স্কোর’ (এফএইচএস) তৈরি করেন। এতে পরিবারের সদস্যদের বিভিন্ন রোগ ও উপসর্গের ভিত্তিতে স্বাস্থ্যঝুঁকি মূল্যায়ন করা হয়। গবেষণায় অংশ নেওয়া পরিবারের ২৬ দশমিক ৩৩ শতাংশ শহরাঞ্চলের এবং ৭৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ গ্রামাঞ্চলের।

গবেষণায় দেখা যায়, ৭৮ দশমিক ৮৫ শতাংশ পরিবার রান্নায় এখনও সাধারণ চুলা ব্যবহার করে। আর মাত্র ২৫ দশমিক ৮১ শতাংশ পরিবারের হাত ধোয়ার পর্যাপ্ত সুযোগ রয়েছে। দূষিত পানি ও অস্বাস্থ্যকর শৌচাগার ব্যবহারের কারণে সবচেয়ে নিম্নমানের স্বাস্থ্য সূচকে থাকা পরিবারগুলোর শিশুদের মধ্যে ডায়রিয়ার প্রকোপ বেশি। এসব পরিবারের প্রায় ১১ দশমিক ৬১ শতাংশ শিশু ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়।

রান্নার ধোঁয়াও পরিবারের সদস্যদের স্বাস্থ্যের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। যেসব পরিবারে রান্নার ধোঁয়া বের হওয়ার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই, সেসব পরিবারের সদস্যদের মধ্যে নিয়মিত কাশি এবং বুক ও নাকের বিভিন্ন সমস্যার উপসর্গ দেখা যায়। বিশেষ করে শিশুদের তীব্র শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে।

গবেষণায় আরও বলা হয়, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও অপুষ্টির কারণে কিছু পরিবারের সদস্যদের ঘন ঘন জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা রয়েছে। আর্সেনিকযুক্ত পানি পানকেও বাংলাদেশের পরিবারগুলোর জন্য বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন গবেষকেরা।

গবেষণায় দেখা গেছে, পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা, বিদ্যুৎ সুবিধা, নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও রান্নার জ্বালানির ধরন স্বাস্থ্য পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। বিদ্যুৎ সুবিধা থাকা পরিবারগুলোর স্বাস্থ্য পরিস্থিতি বিদ্যুৎহীন পরিবারের তুলনায় ভালো।

অন্যদিকে অতিদরিদ্র পরিবারের তুলনায় উচ্চবিত্ত পরিবারের স্বাস্থ্য সূচক তুলনামূলক ভালো। পারিবারিক সম্পদ ও অর্থনৈতিক সচ্ছলতা শিশুদের পুষ্টির ওপরও সরাসরি প্রভাব ফেলে। দরিদ্র পরিবারের শিশুরা অপুষ্টিতে বেশি ভোগায় তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।

গবেষণায় সাধারণ চুলার ব্যবহারকেও গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। ধোঁয়াযুক্ত চুলা ব্যবহারকারী পরিবারের সদস্যদের মধ্যে অসুস্থতার লক্ষণ ধোঁয়ামুক্ত চুলা ব্যবহারকারীদের তুলনায় বেশি দেখা যায়।

এদিকে, পারিবারিক স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার ব্যবহার, নিয়মিত হাত ধোয়া এবং আর্সেনিকমুক্ত নিরাপদ পানি নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন গবেষকেরা। পাশাপাশি পরিবারের প্রধানদের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

সনাতন চুলার পরিবর্তে গ্যাস, বিদ্যুৎ বা আধুনিক চুলা ব্যবহারের সুপারিশও করেছেন তারা। রান্নাঘরে ধোঁয়ামুক্ত জ্বালানি ও পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল নিশ্চিত করা গেলে পরিবারের সদস্যদের অসুস্থতা অনেকাংশে কমানো সম্ভব বলে গবেষকদের মত।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা: বে-নজীর আহমেদ বলেন, গ্রামীণ পরিবারগুলোতে ক্লিন এনার্জির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি। স্বাস্থ্যসম্মত চুলা, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করার পাশাপাশি মানুষকে সচেতন করতে হবে। লাকড়ির চুলা দীর্ঘদিন ব্যবহারে পরিবারের সদস্যদের স্বাস্থ্যগত সমস্যা হতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

এমপি/ আরআই

আরও পড়ুন