শিরোনাম
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৩:০৫, ০৩-১০-২০২৬
ছবি: মেডিকেল পোস্ট
সম্প্রতি লিউকেমিয়ায় আক্রান্ত কুবির শিক্ষার্থী সাজ্জাদ হোসাইন শরিফের চিকিৎসায় ইতোমধ্যে ব্যয় হয়েছে অন্তত ২০ লাখ টাকা। দুই মাস আগে তার বোনমেরু ট্রান্সপ্লান্ট করা হয়েছে। চিকিৎসার ব্যয়ের একটি অংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও বিভাগের সহযোগিতায় সংগ্রহ করা হয়। এখনও কেমোথেরাপি ও অন্যান্য চিকিৎসা চলায় প্রতি মাসে তার পরিবারের প্রায় ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে তার পরিবারকে জমিও বিক্রি করতে হয়েছে।
একই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন কুবির আরেক শিক্ষার্থী তাসনিম হক অনন্যা। ক্যান্সারজনিত সমস্যা থেকে সম্প্রতি সুস্থ হলেও প্রতিমাসে ওষুধ বাবদ তার প্রায় ৬০ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে তার বাবাকে জমি বিক্রি করতে হয়েছে। সহপাঠীরা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে অর্থ সংগ্রহ করে তাকে সহযোগিতা করেছেন।
শুধু সাজ্জাদ ও তাসনিম নন, গুরুতর অসুস্থ আরও অনেক শিক্ষার্থীকে চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে সহপাঠীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ কিংবা ক্রাউড ফান্ডিংয়ের মাধ্যমে সহায়তা নিতে হচ্ছে বলে জানা গেছে। কেউ বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভাগভিত্তিক অর্থ সংগ্রহ করছেন, আবার কেউ আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে ধার করে চিকিৎসা চালাচ্ছেন।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়বহুল চিকিৎসার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে নিয়মিত বা কাঠামোবদ্ধ আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা নেই। অথচ দেশের কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা স্বাস্থ্যবিমার সুবিধা পাচ্ছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য ও জীবনবিমার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ২০২২ সালের ১০ নভেম্বর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রগতি লাইফ ইনস্যুরেন্স লিমিটেডের মধ্যে শিক্ষক এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য সাময়িক জীবনবিমার চুক্তি হয়। এরপর গত বছরের ২৯ ডিসেম্বর তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. হায়দার আলীর উপস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও জেনিথ ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্স লিমিটেডের মধ্যে শিক্ষক এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য জীবন ও স্বাস্থ্যবিমার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ওই সময় শিক্ষার্থীদের জন্য দ্রুত সময়ের মধ্যে সেমিস্টারপ্রতি ১০০ টাকা প্রিমিয়ামে স্বাস্থ্যবিমা চালুর আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। তবে প্রায় নয় মাস পেরিয়ে গেলেও দৃশ্যমান কোনো কার্যক্রম শুরু হয়নি।
লোক প্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী মানসুরা আফরিন বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের জন্য স্বাস্থ্যবিমা থাকা এখন সময়ের দাবি। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থী মধ্যবিত্ত এবং নিম্ন মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র পরিবার থেকে আসা। হঠাৎ বড় ধরনের চিকিৎসার খরচ তাদের পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। তাই বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যবিমা চালু করা হলে শিক্ষার্থীরা আর্থিক ঝুঁকি থেকে কিছুটা সুরক্ষা পেতে পারে।’
এদিকে, দেশের ঢাকা, রাজশাহী ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য স্বাস্থ্যবিমা চালু রয়েছে।
জানা গেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময় এককালীন ২৭০ টাকা প্রিমিয়াম দিয়ে শিক্ষার্থীরা তালিকাভুক্ত হাসপাতালে বছরে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সুবিধা পান। চিকিৎসাধীন অবস্থায় কোনো শিক্ষার্থীর মৃত্যু হলে তার পরিবারকে এককালীন এক লাখ টাকা দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময় বছরে ২৫০ টাকা পরিশোধের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা স্বাস্থ্যবিমার আওতায় আসেন। সেখানে বিমা শিক্ষার্থীদের জন্য বাধ্যতামূলক। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের বছরে ৩৯০ টাকা প্রিমিয়াম দিতে হয়। বিমার আওতায় তালিকাভুক্ত হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিলে বছরে সর্বোচ্চ এক লাখ ২০ হাজার টাকা এবং হাসপাতালে ভর্তি না হয়ে চিকিৎসা নিলে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। কোনো শিক্ষার্থী মারা গেলে এককালীন দুই লাখ টাকা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়েও দ্রুত শিক্ষার্থীদের জন্য স্বাস্থ্যবিমা চালুর দাবি জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থী মন্দিরা দাস বলেন, ‘ঢাবি, রাবি ও জাবির মতো কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়েও স্বাস্থ্যবিমা থাকা দরকার। বিশেষ করে শিক্ষকদের এই ক্ষেত্রে বিবেচনা উচিত যে, তাদের শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে, শহরে এবং বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে চাঁদা তুলে চিকিৎসার খরচ চালায়। এই ক্ষেত্রে শিক্ষক ও প্রশাসনকে আরও আন্তরিক হওয়া উচিত।’
এদিকে, শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যবিমা চালুর বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র পরামর্শক ও নির্দেশনা দপ্তরের পরিচালক ড. মোহাম্মদ জুলহাস উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘আমরা এই ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে, তথ্য বিশ্লেষণ করে যদি উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হয় তাহলে নেব।’
উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন সরকার বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যবিমার ব্যাপারে একবার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সে ক্ষেত্রে ইনস্যুরেন্স কোম্পানিগুলো কিছু জটিলতা দেখিয়েছে। আমরা আবার কথা বলব। কোনো কোম্পানি আগ্রহ দেখালে আমরা তাদের সঙ্গে কাজ করব।’
এমপি/ আরআই