ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬

২৭ আশ্বিন ১৪৩৩, ২৯ রবিউস সানি ১৪৪৮

মধ্য আফ্রিকায় বাড়ছে অবৈধ ওষুধের কারবার, জব্দ ২৫১ টন ওষুধ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ০৩:২৩, ০৭-১০-২০২৬

মধ্য আফ্রিকায় বাড়ছে অবৈধ ওষুধের কারবার, জব্দ ২৫১ টন ওষুধ

ছবি: মেডিকেল পোস্ট

মধ্য আফ্রিকার পাঁচ দেশে গত ছয় বছরে ২৫১ টন চিকিৎসা পণ্য জব্দ করেছে কর্তৃপক্ষ। অ্যান্টিবায়োটিক, ম্যালেরিয়ার ওষুধ, ব্যথানাশক থেকে শুরু করে ট্রামাডল ও প্রিগাবালিনের মতো মনঃপ্রভাবক ওষুধও রয়েছে জব্দ তালিকায়। জাতিসংঘ বলছে, দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে এ অঞ্চলে বিস্তৃত হচ্ছে অবৈধ ওষুধের বাজার।

গতকাল (৬ অক্টোবর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তর (ইউএনওডিসি)। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও মধ্য আফ্রিকার অর্থনৈতিক ও মুদ্রা সম্প্রদায়ের (সিইএমএসি) সহযোগিতায় প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ক্যামেরুন, কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, গ্যাবন, মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র ও চাদে মোট ২৫১ টন চিকিৎসা পণ্য জব্দ করা হয়। ২০২০ সালে জব্দের পরিমাণ ছিল প্রায় ৫ টন। ২০২৪ সালে তা বেড়ে ১১৬ টন এবং ২০২৫ সালে ৯৭ টনের বেশি হয়।

তবে জব্দের পরিমাণ বাড়াকে সরাসরি অবৈধ ওষুধের বাণিজ্য বৃদ্ধির প্রমাণ হিসেবে দেখার বিষয়ে সতর্ক করেছে ইউএনওডিসি। তাদের মতে, এর পেছনে পাচার বাড়ার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বৃদ্ধিও ভূমিকা রাখতে পারে।

২০২৫ সালে জব্দ হওয়া ওষুধের প্রায় পুরোটাই ক্যামেরুন থেকে করা হয়। দেশটিতে ওই বছর ৯৬ টন চিকিৎসা পণ্য জব্দ করা হয়, যেখানে পাঁচ বছর আগে জব্দ হয়েছিল মাত্র ২ দশমিক ৫ টন। এসব পণ্যের মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিক, ম্যালেরিয়ার ওষুধ, প্রদাহনাশক, ব্যথানাশক এবং ট্রামাডল ও প্রিগাবালিনের মতো মনঃপ্রভাবক ওষুধ রয়েছে।

ইউএনওডিসির পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকা অঞ্চলের প্রতিনিধি সিলভি বার্ট্রান্ড বলেন, এই অবৈধ বাণিজ্য সমুদ্র, নদী, আকাশ ও সড়কপথ ব্যবহার করে পরিচালিত হয় এবং এর সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের ব্যক্তি ও গোষ্ঠী জড়িত।

এদিকে, প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অবৈধ ওষুধের বাজার বিস্তারের পেছনে শুধু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নয়, দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থাও বড় কারণ। ম্যালেরিয়া, যক্ষ্মা ও এইচআইভি এখনো এ অঞ্চলে ব্যাপকভাবে রয়েছে। অথচ সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত চিকিৎসা দিতে পারছে না।

২০২৩ সালে ডব্লিউএইচওর সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা সূচকে সিইএমএসির ছয়টি দেশই বিশ্বের সবচেয়ে দুর্বল দেশগুলোর মধ্যে ছিল। চাদের স্কোর ছিল ১০০-এর মধ্যে মাত্র ২৬, যেখানে বৈশ্বিক গড় ৭১।

চিকিৎসাকেন্দ্রের দূরত্ব ও ওষুধের উচ্চমূল্য পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র ও চাদে অর্ধেকের বেশি মানুষ জরুরি চিকিৎসা দেওয়া সরকারি হাসপাতাল থেকে অন্তত দুই ঘণ্টার দূরত্বে বসবাস করেন। চাদে সবচেয়ে কম বেতন পাওয়া সরকারি কর্মচারীর প্রায় ১৬ দিনের মজুরির সমান একটি ইনসুলিন সিরিঞ্জের দাম। ফলে অনেক মানুষ বৈধ চিকিৎসাব্যবস্থার পরিবর্তে রাস্তার বিক্রেতাদের কাছ থেকে ওষুধ কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের কয়েকজন ভোক্তা গবেষকদের জানিয়েছেন, ফার্মেসি থেকে ১২টি ট্যাবলেটের পুরো প্যাকেট কেনার বদলে প্রায় ২০ সেন্টে একটি বা দুটি ট্যাবলেট কেনা যায়।

ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত মধ্য আফ্রিকার অর্থনৈতিক অঞ্চলে ২২৮টি চিকিৎসা পণ্য নিয়ে সমস্যা শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৭১ শতাংশ ছিল নকল এবং ১১ শতাংশ নিম্নমানের। এসব ঘটনার এক-তৃতীয়াংশ নিয়ন্ত্রিত সরবরাহ ব্যবস্থার মধ্যেই শনাক্ত হয়েছে।

এ ছাড়া ভুল উপাদান বা ভুল মাত্রার ওষুধ গ্রহণে বিষক্রিয়া, চিকিৎসা ব্যর্থতা এমনকি মৃত্যুও হতে পারে। পাশাপাশি এসব ওষুধ অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বাড়িয়ে দিতে পারে।

ইউএনওডিসি জানিয়েছে, ২০২৩ সালে ক্যামেরুনে দূষিত উপাদানযুক্ত শিশুদের সিরাপ সেবন করে ১২ শিশু মারা যায়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অবৈধ বাজার এমন একটি চাহিদা পূরণ করছে, যা বৈধ স্বাস্থ্যব্যবস্থা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। তাই শুধু অবৈধ সরবরাহ বন্ধ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। ওষুধের ঘাটতি, উচ্চমূল্য ও চিকিৎসাকেন্দ্রের দূরত্ব কমানোর পাশাপাশি নিরাপদ ও সাশ্রয়ী ওষুধের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে হবে।

এ ছাড়া অবৈধ ওষুধের বাণিজ্য ঠেকাতে দেশগুলোর মধ্যে আইন সমন্বয়, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ জোরদার এবং আন্তঃদেশীয় সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে ইউএনওডিসি।

এমপি/ আরআই

আরও পড়ুন